জলছবি প্রকাশন

সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান

Home » হরিণপালা

হরিণপালা


আমার নাম—রনক—রনক আহমেদ খন্দকার। মা-বাবা আদর করে ‘রনু’ বলে ডাকতেন। আজ দোসরা ফাল্গুন, আমার জন্মদিন। যদিওবা এখন আমি আর জন্মদিন পালনে অভ্যস্ত নই, তবু কাকা মস্ত একটা কেক আনিয়ে ধুমধাম করে আমার একুশের জন্মদিনকে পালন করলেন কেন জানি না। ধরে নিলাম, আঘাতপ্রাপ্তকে আনন্দ দেওয়াই হয়ত উদ্দেশ্য। তবে এক দিনের আনন্দ সারা জীবনের বেদনাকে হ্রাস করতে পারে কি? পারে না। ছোটবেলাতে অনেকের মতো আমারও দুয়েকটা অভ্যাস ছিল। সেগুলোকে কেউ কেউ বদভ্যাসও বলত। জন্মদিনের বায়না ধরে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে হইচই করে মাতা এবং যখন তখন নাবলে দূরে কোথাও উধাও হয়ে যাওয়া। এখন বুঝি, প্রথমটা অভ্যাস হলেও দ্বিতীয়টা বদভ্যাস। তবে এমন অভ্যাস ভালো হলেও বদভ্যাস মোটেও ভালো না। কারণ, এ জায়গায় বিপদের সম্ভাবনা বেশি। যেমন—গাড়িদুর্ঘটনা, হারিয়ে যাওয়া, লঞ্চডুবি, ডাকাতের পাল্লায় পড়া এধরণের আরো কত কি। তাই—যেপথে বিপদের সম্ভাবনা বেশি সেপথ এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের কাজ।

বাবারা ছিলেন দুই ভাই। বাবার নাম রঞ্জন আর কাকার নাম সঞ্জন। কাকাকে আমি আমার খুব ছোটবেলায় দেখেছি, চেহারা পরিষ্কার মনে না থাকলেও দেখামাত্র চিনতে ভুল হয়নি। পরিষ্কার মনে আছে, দাদার সঙ্গে লড়াই করে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত একজন মানুষ। ব্যবসাবাণিজ্যে সুনাম আছে। দাদার মৃত্যুর খবর বাবা কাকাকে জানাতে পারেননি, কারণ তখনও কাকার হদিশ পাওয়া যায়নি। দাদার মৃত্যুর বছরখানেকের পর বাবার কাছে একটা চিঠি এলেন। কাকার চিঠি পেয়ে দেখি বাবা অনেক খুশি হলেন। তারপর বাবা আর কাকার মধ্যে রীতিমতো যোগাযোগ। কিন্তু আসবে আসবে করে বাবার জীদ্দশায় কাকার আর আসা হয়নি! বাবার মৃত্যুর খবর শোনামাত্র ছুটে এলেন। তখন কাকাকে আমার স্পষ্ট দেখা। আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কান্নাকাটি করলেন এবং সঙ্গে নিয়ে এলেন কাকার বাড়িতে। আমি আসতে অনাগ্রহ দেখালে কাকা নাছোরবান্দা—এখানে তোর কে আছে বলে ধমকায়ে নিয়ে এলেন সঙ্গে।
আমি কেঁদে বললাম—কাকা, মাকে হারানোর পর বাবাই ছিল আমার সবকিছু। আজ যখন বাবা আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন, তা হলে আমি কি বাবাকে ছেড়ে চলে যেতে পারি! বাবার কবর দেখেই আমার জীবন কাটুক।
কাকা বললেন, ওখান থেকে এসেই মাঝের মধ্যে দেখে যাবি আর কি। আমি বাধ্য শিশুর মতো মাথা নেড়ে ‘ঠিক আছে’ বলে চলে আসি কাকার সঙ্গে।

কাকার বাড়ি হরিণপালা। সম্পূর্ণ পাহাড়ি এলাকা। শহরের যান্ত্রিকঝঞ্ঝাট থেকে নাকি পাহাড়িপরিবেশ ওনার অত্যন্ত পছন্দ। তাই শহর থেকে সরে এসে মুক্তপরিবেশেই বসবাস। কাকার বাড়িটি আমার খুব পছন্দ হয়। প্রায় দুই বিঘার মতো পরিধি। সমস্ত ফলফলাদির গাছ থেকে শুরু করে সামান্য মেটেলতা পর্যন্ত কি নেই এ বাড়িতে! দোতলায় থাকে কাকা আর কাকিমা। নিচের তলায় তাঁদের দুই মেয়ে এক ছেলে ‘ঝিনুক’ আর ‘ঝিলিক’ এবং ‘রিহান’। তার পরেও বেশ কক্ষ খালি। চাকরচাকরানিদের ঘর আলাদা, মস্ত উঠোনের শেষকোণায়। তাদের ঘর আলাদা করার একটা কারণ জানতে পারি, কাকার এক বছরের একটি ছেলেকে নিয়ে নাকি একজন চাকরানি পালিয়ে যায় এবং আজ পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান মেলেনি! প্রায় চোদ্দ বছর আগের ঘটনা। কাকিমা তার স্মরণে আজও বিলাপ ধরে কাঁদে এবং কাঁদতে কাঁদতে একসময় হুঁশহারা হয়ে প্রলেপ বকাবকি শুরু করে। আমার মতো অজান্তা কেউ দেখলে অবশ্য মানসিকরোগী মনে করতে ভুল করবে না। আমি দক্ষিণের একটা কক্ষ বেছে নিলাম। মাঝে মস্তবড় হল। উত্তরে ঝিনুক আর ঝিলিকের রুম এবং তাদের পাশের কক্ষ রিহানের। রিহান সকলের ছোট। বয়স বার-কি-তের। আমি মেয়েদেরকে খুব সংকোচ করি তাই রিহানকে চুপিচুপি বললাম, তুমি আমার রুমে চলে এস, তোমার সঙ্গে আমার অনেক গল্প হবে। সে অত্যন্ত খুশি হলো।

রিহানের বই পড়ার আগ্রহটা দেখছি অনেকটা আমার মতোই! তার কয়েকটা ভূতের বই ইদানীং আমার পড়া হয়ে গেছে, এখন ঝিনুকের একটা আইনবই পড়ছি। ঝিনুক ‘ল’ নিয়ে পড়ছে, বয়স আনুমাণিক ঊনিশ-কুড়ি হবে। কাকা আমার বই পড়ার আগ্রহ জানতে পেরে প্রতিনিয়ত আমার জন্যে কিছু-না-কিছু বই নিয়ে আসতে শুরু করলেন এবং আস্তে আস্তে আমার কক্ষ প্রায় লাইব্রেরি হয়ে ওঠে।

নিঝ্‌ঝুম দুপুর—একদিন জানালার পাশে বসে বই পড়ছি। জানালাটা প্রায়ই খোলা রাখি, কারণ ঝোপঝাপ বাঁশঝাড় গাছগাছালি দেখতে কারনা ভালো লাগে। পাখিদের কিচিরমিচির ডাক, নির্মল বাতাস, শোঁশোঁ আওয়াজ সব সময় এসব প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়া বড়ই কঠিন আর এখন আমার রুমের মস্ত জানালা দিয়ে এগুলো পরিষ্কার দেখা যায় এবং সান্নিধ্য অনুভব করা যায়। এমন সময় দেখি একটা ছেলে আড়ালে দাঁড়িয়ে গলাটেনে বারবার উঁকি দিচ্ছে, চোখাচোখি হতেই সরে দাঁড়ায়! রিহানকে ডেকে বললাম, ছেলেটাকে একটু ডেকে আনতে।
রিহান—ওরে বাবা! চোখেমুখে তার আতঙ্কভাব—মা দেখলে নিস্তার নেই। আমি অবাক! রিহানকে আর কিছু জিগ্যেস করলাম না কিন্তু আমার কতূহলটা থামানো যাচ্ছে না—বেড়েই চলছে। ভাবছি কাকিমার সঙ্গে কিভাবে কথা বলা যায়। ওঁ কারো সঙ্গে তেমন একটা কথাবার্তা বলেন না তবে বললেও খুব সীমিত। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আর কুরআনপাঠ—ধর্মকর্মতে দেখি সারাক্ষণ ওঁর মন। তাই বেশি পেঁচাল পাকাতেও মন চাচ্ছে না। তবু ছেলেটার সম্বন্ধে যে আমার জানা দরকার। আমি কোনকিছু পুরোপুরি জানতে না পারলে মনে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

কাকা আর রিহান আজ বাড়িতে নেই। কাকা ব্যবসার কাজে মাঝের মধ্যে এরকম বাইরে কাটান। আজ গেছেন নাকি দুয়েকদিনের সফরে কোথা বলে দূরের রায়ের বাজার। রিহান গেছে বন্ধুর বোনের বিয়েতে পাশের শাঁখারিঘাট। আমি রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে রুমে এসে ঢুকছি, দেখি কাকিমা এসে হাজির—ওঁর পিছে পিছে দেখি ঝিনুক আর ঝিলিকও! আমি আশ্চর্য হলাম—মনে মনে ভাবলাম, ব্যাপার কী! আমার কোনো দোষ? দেখছি না, কাকিমা নরমগলায় বললেন—রনক, তুমি নাকি সেদিন রিহানকে বলেছিলে কিত্ত পাগলাকে ডাকতে? আমি খুব নম্রতার সঙ্গে নিচুগলায় বললাম, হাঁ কাকিমা।
কাকিমা বললেন, তুমি জানো না বাবা অই পাগলটা কেমন। তুমি শান্ত ছেলে তাই বলছি, পাগলটার সঙ্গে কখনো কথা বলো না।
আমি বললাম, এমন একজন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও হৃষ্টপুষ্ট ছেলে পাগল কেন হবে কাকিমা? তবে আমার মনে হয় না সে পাগল।
কাকিমা বললেন, তাকে দেখে একথা কেউই মনে করতে পারে না।
একটু চুপ থেকে বলছে, আর হৃষ্টপুষ্ট ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হলে যে পাগল নয় কে বলে? পাগল অনেক ধরনের হয়ে থাকে বাবা। সুতরাং ওর কাছ থেকে সব সময় দূরে থেকো।
আমি আর কোনো তর্ক না বাড়িয়ে কাকিমাকে খুশি করাতে বললাম, ঠিক আছে কাকিমা। কাকিমা চলে গেলেন। ঝিনুক আর ঝিলিকের সঙ্গে কথা হচ্ছে। ভেতরে ভেতরে আমি যেন লজ্জায় মরে যাচ্ছি। ঝিনুকের চেয়ে ঝিলিক নাকি দুবছরের ছোট। খুব রসিকতা করে কথা বলে। আনন্দ যেন তার সব সময়ের সঙ্গী। এটকুপর ঘুমের হাই তুলে সেও চলে যায় ঘুমোতে। রাত প্রায় বারটা ছুঁই ছুঁই। ঝিনুক আর আমি একা। জীবনে এ প্রথম আমি কোনো মেয়ের সঙ্গে এভাবে একা ঘরে—একা বসে কথাবার্তা বলছি! শুধু লজ্জা নয় আর তারচেয়ে আরো বেশি অনুভব হচ্ছে ভয়সঙ্কোচ। সুনসান রাস্তায় হাঁটলে যেমন ছমছম করে গা, তারচেয়ে বেশি ধড়ফর করছে আমার বুক! এখন আর ঝিনুকের মুখের দিকে একটিবারও তাকাতে পারছি না! ঝিনুক কতটুকু বুদ্ধিমতী জানি না তবে এমন অবস্থা সহজেই যেকেউ আঁচ করতে পারে। একটা বই খুলে পড়ার ভানে পাতার পর পাতা উল্টাচ্ছি। ঝিনুক বোধহয় মনে মনে হাসছে এবং কোনো কথাই হয়ত খুঁজে পাচ্ছে না। ইতস্তত করছে আর একসময় বলছে—ভাইয়া, জানালার পাশে যে, এত্ত বইপত্তর রাখছেন সেগুলো নিরাপদ নয়।
আমি আশ্চর্য অনুভব করে বললাম—কেন?
ঝিনুক বলল, কিত্ত ডাকাতের সর্দার—সুযোগ পেলেই চিলের মতো ছোঁ মারবে।
আমি অবাক হলাম—বললাম, ও কি চুরি করে?
ঝিনুক বলল, শুধু চুরি নয়, বাধা দিলে আপনার মাথার খুলি উড়িয়ে দেবে—এমন বদমাশের বদমাশ।
আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম—বাপ রে বাপ! এমন জঘন্য?
ঝিনুক বলল, গেরামের সবাই তাকে যমের মতো ভয় করে। সারা গেরাম টো টো করে ঘুরবে আর চুরিচামারি করবে, কেউ কিছু বললে ইটপাটকেল মেরে তার মাথা ফাটাবে। আমরা তাকে রাস্তায় দেখলে অইদিকে আর যাই-ই না। আমি আর কথা বাড়ালাম না এবং আর কোনো কথা না-বলায় দেখে ঝিনুক ‘যাচ্ছি’ বলে উঠে তার রুমে চলে গেল। এবার আমার কতূহল আরো বেড়ে চলল!

কয়েকদিন পর রাতে সকলে মিলে খেতে বসছি। টেবিলের এপাশে আমরা অপর পাশে কাকা আর কাকিমা। কাকা আমাকে জিগ্যেস করলেন কেমন লাগছে আমার। এখানে মন বসছে কি না ইত্যাদি। কাকিমা সবার পাতে এটা-ওটা তুলে দিচ্ছেন।
আমি বললাম, একটু একটু…তবে কাকা, এ জায়গার নাম হরিণপালা কেন? সঙ্কোচ করেই জিগ্যেস করলাম।
কাকা ভাত মাখতে মাখতে হেসে বললেন, আজব কথা ত! কারো মুখে একথা কখনো শুনিনি বা কাউকে কখনো জিগ্যেস করতেও দেখিনি! হঠাৎ তোর মনে এপ্রশ্ন কেন? সকলে খাচ্ছে শুধু কাকিমা এখনো খাওয়া শুরু করেননি, সবার পাতে কী আছে না আছে দেখছেন আর সকলের গ্লাসে পানি ঢেলে দিচ্ছেন।
আমিও ভাত মাখতে মাখতে বললাম, হঠাৎ নয় কাকা। হঠাৎ করে আসলে বিশেষ কিছু মনে আসে না এবং হঠাৎ করে কোনো কিছু ঘটেও না। যা হয় এবং ঘটে সব কারো-না-কারো পরিকল্পনা অনুযায়ী। সকলের খাওয়া প্রায় আধা হয়ে গেছে, কাকিমা মাত্র খাওয়ার শুরু করলেন।
কাকা ভাতের পাতে হাতটা রেখে একটুর জন্যে খাওয়াটা বন্ধ করলেন আর আমার মুখের দিকে চেয়ে অবাককণ্ঠে বললেন, তুই ত দেখছি অনেক যুক্তি দিয়ে কথা বলতে জানিস! তারপর পাতে একটু ঝোল নিয়ে আমাকে বললেন, তুই এত কম খাস কেন? ভাত আর চারটা নেসনা বলে ভাতের গ্রাস মুখে তুলে নিতে নিতে বললেন—ঠিক আছে, কালপরশুর মধ্যে তোকে এ জায়গার নাম ‘হরিণপালা’ কেন জানিয়ে দেবো।
আমি বললাম—থাক গে কাকা, এত জরুরি বিষয় না। নামটা আমার কাছে অপূর্ব লাগল তাই মনে করলাম এর কোনো মর্মার্থ থাকতে পারে।
কাকা বললেন, থাকবে না কেন, নিশ্চয় আছে; যেকোনো জিনিসেরই একটা গূঢ় অর্থ থাকে।
আমি মনে মনে ভাবছি, কাকাকে লজ্জায় ফেলে দিলাম না ত? ওটা ভুলানো দরকার মনে করে বললাম—আচ্ছা কাকা, কিত্ত নামের ছেলেটিকে সবাই পাগল বলে কেন?
কাকা বললেন, তুই কি তার সাথে কথা বলেছিস?
আমি বললাম, না।
কাকা বললেন, তা হলে?
আমি বললাম, তার ঠাটবাট চালচলন দেখে।
কাকা বললেন, কিভাবে দেখলি?
আমি বললাম, আড়ালথেকে প্রায়সময় আমার জানালায় উঁকি মারে। চোখাচোখি হলে দ্রুত সরে যায়। ছেলেটির পোশাক-আশাকে ত মনে হয় না সে পাগল বা কোনো গরিবঘরের ছেলে।

সকলের খাওয়া শেষ। কাকিমা বাসনকুসনগুলো এবং বাকি খাবারগুলো পরিচারিকার দিয়ে রান্নাঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন। ঝিনুক, ঝিলিক ও রিহান বসে আছে কাকার কথাগুলো শোনতে। কাকা একটুখানি হেসে ‘অনেক লম্বা কথা’ বলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এবং বললেন, কিত্ত আসলেই বড় পরিবারের ছেলে। পাশের গ্রাম মুরাদনগরে তাদের বাড়ি। তার পরদাদা মুরাদুদ্দিন খালজির নামে গ্রামের নাম। অবশ্য লোকে তাকে যেধরনের পাগল মনে করে আসলে কিত্ত সেধরনের পাগল নয়। যেমন ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’ কিত্তের বেলায়ও অনেকটা সেরকম। বাপদাদারা যা সম্পদ রেখে গেছে তার দশ জনমের জন্যে যথেষ্ট ছিল কিন্তু কিত্ত এজনমেই বোধহয় তা শেষ করে যাবে! কি সম্পদ কোথায় আছে এগুলোর কোনো ধারও ধারে না, খোঁজখবরও নেয় না এবং কে কোথায় কিভাবে ভোগ করছে কেউ জানালেও জানতে চায় না। কোনো ভিক্ষুক কিছু চাইলে হাতের কাছে যা পেত নিয়ে এসে দিয়ে দিত। এমনকি সোনারুপো পর্যন্তও দিয়ে দিতে একটু ভাবত না! অবশ্য এখন আর তেমন পাগলামিটা করে না। তার মা মারা গেলে তার বাবা ‘ছমিরুদ্দিন’ আবার বিয়ে করে। ওরকম দানের জন্যে নাকি তার সৎমায়ের প্ররোচনায় পাগল বলে তাকে অনেকবার শিখলে বেঁধে রাখতেও শোনা যায়। অমন দানপাগল ছেলে পৃথিবীতে আসেনি বললেই চলে। তাই লোকের মুখে মুখে ছেলেটি পাগল বনে যায়…
আমি আশ্চর্য অনুভব করে বললাম, দানের বিনিময়ে পাগলোপাধি? এমন ত কখনো শুনিনি!
কাকা বললেন, ভবিষ্যতেও হয়ত আর শোনা যাবে না। কারণ একবার যা ঘটে তা পুনরায় খুব কম ঘটে। কিত্তের দান সচরাচর মানুষে করে না। তার বাড়িতে একসময় সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত ভিখেরিদের লাইন লেগে থাকত। ভিখারিরা দশ গ্রাম ঘুরে যা পেত না কিত্তের এক দুয়ার থেকে এরচেয়ে অনেকবেশি পেত। সেটা অবশ্য তার বাবার মৃত্যুর পর।
আমি আরো আশ্চর্য হলাম—বললাম, এ ত মস্তবড় নেককাজ, এখানে পাগলামির কী আছে?
কাকা বললেন, আছে—এক টাকা কামাই না করে যে বাপদাদাদের সম্পদ বিক্রি করে করে দান করে তাকে এসমাজ দানীর বদলে পাগলামিটাই বেশি বলে। দান করা ভালো তবে কিত্তের মতো সর্বস্ব দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে নয়।

কাকার বাড়ির উত্তরে সদরমফস্বলের বড়রাস্তা। অনেকটা কাছাকাছি। ভারীসব যানবাহনের চলাচল। দক্ষিণে বাড়িঘেঁষাঘেঁষি করে চলে গেছে একটা কাঁচারাস্তা। রাস্তাটা নাকি ভাঙাদিঘি হয়ে রাঙাখালি পর্যন্ত চলে গেছে। ট্যাক্সি, রিক্‌শা, সাইকেল ও মোটরসাইকেল এসব ছোটখাটো যানবাহনের চলাচল দেখা যায়। প্রতিদিন বিকালবেলায় বের হয়ে আমি একলা একলা এরাস্তায় অনেকক্ষণ হাঁটি। হাঁটাহাঁটি করতে যদিওবা আমার ভালো লাগে না তবু ঘরে বন্দী হয়ে থাকার চেয়ে কিছুক্ষণ মুক্তবাতাসে হাঁটাহাঁটি করা ভালো—মনের ক্লান্তি দূর হয়। তার পরেও হাঁটাহাঁটি স্বাস্থ্যের জন্যে নাকি বেশ উপকার। তাই মনে করি হাঁটাহাঁটির অভ্যাসটা তৈরি করা দরকার। এমন সময় দেখি গালিগালাজ করতে করতে হাতের নাগালে যা পাচ্ছে তা ছুড়ে মারতে মারতে একদল কিশোরকে তেড়ে নিয়ে আসছে কিত্ত আর দুষ্ট ছেলেরা ‘কুত্ত পাগল’ ‘কুত্ত পাগল’ করে করে তাকে খেপাতে খেপাতে ধেয়ে যাচ্ছে। তাদের শেষগন্তব্যে আসলে আমি ডাকলাম ‘কিত্ত’ কিত্ত আমার দিকে আতঙ্কিত হয়ে বড় বড় চোখ করে তাকাল। আমি শান্তগলায় অভয় দিয়ে কাছে ডেকে একটা গাছের নিচে বসালাম। অনেক কিছু জিগ্যেস করে বললাম, তোমার আর কোনো ভালো নাম আছে বন্ধু? নাকি এটাই একমাত্র নাম?
কিত্ত লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করা যায় তবে দুঃখ নিজের অন্তরেই রাখতে হয়, তা শুনার বান্ধব একমাত্র নিজের আত্মা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো সত্তা পৃথিবীতে নেই। তাই দুঃখের কথা সবাইকে বলা যায় না।
তার কথায় আমি আশ্চর্য হলাম এবং অনুরোধ করে বললাম, আমাকে একটু করে বললে খুশি হব।

কিত্ত এবার বলতে শুরু করল, আমার নাম—কৃতার্থ। আমার পূর্বপুরুষেরা অবশ্য বড় জমিদার ছিলেন বটে কিন্তু আমি নই। কারণ, আমি শূন্য হাতে এসেছি, শূন্যই যেতে হবে এবং শূন্যই যেতে চাই। কোন্‌ সিদ্ধকামে মুগ্ধ হয়ে আমার অভিভাবকেরা এ নাম রেখেছিলেন জানি না, এ নামের যথাযোগ্য পাত্র বোধহয় আমি নই। কানা ছেলের নাম যেমন ‘পদ্মলোচন’ সম্ভবত এ অপদার্থের বেলায়ও শব্দটা যথার্থ। জীবনে যাই হবে হোক বা ঘটে ঘটুক অথবা করব করি কিন্তু পরের ধনে পোদ্দারি করতে আমি পৃথিবীতে আসিনি, না এসেছি নিজের নাম বিকৃত করতে। সবাই বলে, বাপদাদাদের সম্পত্তির অপচয় করে আমি যে বোকামি করছি, তা কোনো পাগলেও করবে না। তাই আমি কিত্ত পাগল। একারণে আমার পাগলামিটা আরো একটু বাড়িয়েছি। দান করলে যে আপদ কাটে এবং সম্পদের পরিশুদ্ধি হয়, তা মনে হয় আমার পূর্বপুরুষগণ জানতেন না। যদি জানতেন, তা হলে অমন পর্বতের মতো সম্পদ রেখে সিদ্ধিলাভ করতেন না। একজন মানুষের কতটুকুইবা সম্পদের প্রয়োজন হয় এবং হওয়া চাই! তাই যতটুকু সম্পদ বাপদাদারা রেখে যান তাঁদের মতো বিলাসিতা করে চললেও আমার দশ জনম চলে যায়। কিন্তু আমি পৃথিবীতে আছি কতক্ষণ এটাই ত বড় বিষয়। মানুষ জীবনকে যতটু আনন্দে উপভোগ করার কথা ভাবে, ততটু যদি মৃত্যুকে নিয়ে ভাবত, তা হলে বোধহয় অমন পর্বতের মতো সম্পদ উপার্জন থাক, আরাম-আয়াশে একপল জীবনযাপনও উপভোগ করতে পারত না। ধর্মের প্রতি আমার টান থাকলেও কিন্তু বিকৃত—অর্থাৎ লোকদেখানো ধর্মকর্মতে আমার আপত্তি। কারণ, ধর্মকাজ দেখিয়ে যারা ভালো মানুষ সাজে তারা ত ভালো নয়ই বরং ধর্মকেও কাড়া করে মন্দের কাতারে। এমন ধর্মকাজ করে লাভ কি? কথায় আছে, যতক্ষণ মনে গ্লানি ততক্ষণ অমৃতও পানি। আমি বুঝি, মানুষ যতই আমাকে মন্দ বলুক আমার কর্ম যদি ভালো হয় এটাই আমার ধর্ম এবং এটাই আমার ধর্মকাজ। আমি স্রষ্টার কাছে মাথা নত করব কিন্তু কোনো সৃষ্টির কাছে নয়। আমি মনে করি, মানুষের কাছে যতই তিরস্কৃত হওয়া যায় স্রষ্টার কাছে তার প্রতিদান ততই বেশি। আমার জন্মের সময় মা যখন মারা যান তারপর কিছুদিন নাকি আমি পরিচারিকার পরিচর্যায় থাকি। তারপর বাবা যখন আবার সংসার পাতে সৎমায়ের অনাদরে প্রায় দশ বছরের মতো মানুষ। তারপর বাবা যখন মারা যান, নিঃসন্তান সৎমায়ের ঘৃণা থেকেও বঞ্চিত হই। কারণ, সৎমা বাপের আশ্রয়ে চলে গেলে আমার আশ্রয় আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কোনো অবলম্বন রয় না।

একটু নীরব থেকে বলল, বাপদাদারা আজ কোথায়। কেউ কি এতটু সম্পদ নিয়ে যেতে পারছে। বাপদাদাদের বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে যে কুনাম রটিত আছে সেই সুনাম অর্জন করাই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য। নিজের বদান্যতাকে জাহির করা নিজের জন্যে শোভনীয় নয়, তবু কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজের বদান্যতাকে জাহির করতেই হয়। তা থেকে যদি মানুষ শিক্ষা লাভ করতে না পারে, তা হলে সেটা মানুষের দোষ নয়—আদত। দেওয়ার মাধমেই মানুষ বড় হতে পারে, নেওয়ার মাধমে নয়। এ পৃথিবীতে কিছু শ্রেষ্ঠ স্থান আছে এবং কিছু নিকৃষ্ট। যেমন, আরাধনালয় শ্রেষ্ঠ পতিতালয় নিকৃষ্ট এবং তীর্থালয় শ্রেষ্ঠ বাজার নিকৃষ্ট। এরকম মানুষের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ এবং নিকৃষ্ট বিদ্যমান। ভালো কাপড় পরলে যে, সে ভালো মানুষ সেটা অযৌক্তিক। চালচলন ও ব্যবহারেই হচ্ছে ভালো মানুষের পরিচয়। কথায় আছে, আদা পচলেও তার ঝাঁজ যায় না। ছোটলোক যতই বড় হোকনা কেন, ক্ষুদ্রতার পরিচয় দিবেই দিবে আর বড়লোক যতই ছোট হোক বৃহত্তের আদর্শ ছাড়বে না। তাই মানুষে প্রায়ই আমার উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যেত : এটাও সম্ভবত মানুষের আদত—অই দেখ লাটের পুত যাচ্ছে। দুহাতে টাকা না উড়ালে তার চলে না! চালচলনের হাবভাব দেখলে গায়ে কাঁটা দেয়—নবাবের নাতি। বাপদাদারা গাঁজাখোরিতে কেটেছে জীবন আর যা আছে এ মদনের জমিদারিতে যাবে। আমিও কিন্তু তা চেয়েছি। তবে জমিদারিতে নয় সর্বসব বিলিয়ে দিতে। দুর্ভাগ্য আমার তাতে পেয়েছি পাগলের তকমা। কৃতার্থ থেকে হলাম মানুষের পরিহাসের পাত্র। আসলেই কি আমি লাটের পুত নই? বেশিরভাগ মানুষ কথা বলে চিন্তা ছাড়া। নিজে কী বলে নিজেও জানে না! এঁরাই আবার সমাজে ভালো মানুষ!

তার কথা শোনে আমি রীতিমতো অবাক হলাম। এ ছেলে কি কখনো চুরি করতে পারে? এমন আদর্শিত কথাবার্তা কোনো পাগলের পক্ষে বলা কি সম্ভব? মোটেই না। এটা আসলেই মানুষের রটানো। মানুষ মহামানবকে যেখানে পাগল বলতে ছাড়েনি সেখানে কৃতার্থের মতো সাধারণ একজন খুবই স্বাভাবিক। অসভ্যরা আসলে কোনো সভ্যতাকেই ভালবাসে না। এটা মানুষের স্বভাব। ভালো মানুষকে তারা পাগল বানাবেই, তারা জানে না আসলে তারাই প্রকৃত পাগল। আমি সান্ত্বনার কণ্ঠে তার সবদিক প্রশংসা করলাম এবং নামের বিষয়ে তার ক্ষোভ দেখে বললাম, দুঃখ কেন করছ তুমি? ‘কিত্ত’ নামটাও ত যথেষ্ট সুন্দর, একেবারে অনন্য। তুমি কখনো মন ছোট করো না, হয়তবা স্রষ্টা তোমার মধ্যে কোনেকটা সৌন্দর্য লুকিয়ে রেখেছেন; তার থেকে হয়ত মানুষের ওসব পরিহাস। জানো কি বন্ধু, বিধাতা যাকে মনোনিত করে তাকে সব সময় মানুষের দ্বারা এভাবে ঠাট্টাপরিহাস করায়।
কৃতার্থ বলল, আপনি যা মনে করছেন এমন নয় সাহেব, তারা যে আমাকে সংক্ষেপে আদর করে ‘কিত্ত’ বলে এমন না। তারা আমাদের পূর্বপুরুষদের উপর ঈর্ষান্বিত হয়ে এমন আচরণ করে। এখানে আমার দুঃখ, একের কর্মফল অপরে কেন ভোগ করবে!
আমি সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, দুঃস্বপ্ন মনে করে ভুলে যাও অইসব। দরদ সহ্য করতে পারলে সে প্রকৃত পুরুষ। আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু। আমি তোমাকে ‘কৃতার্থ’ বলেই ডাকব। কিন্তু, আমি যেভাবে বলি সেভাবেই চলতে হবে তোমাকে। তার নীরবতা দেখে বললাম—কি, পারবে না? ‘কেন পারব না’ বলে কৃতার্থ অত্যন্ত খুশি হয়ে আমার বন্ধুত্বটাকে সৌভাগ্যের প্রতীক মানল এবং আমাকে জড়িয়ে ধরল।

আমার সঙ্গে কৃতার্থের অসম্ভব ভাব হয়ে গেল। আমার প্রতি দেখি সে অত্যন্ত আকৃষ্ট হলো। প্রতিদিন আমার বাইরপথে দাঁড়িয়ে থাকে। বাড়িতে আসতে বললে লজ্জা দেখায়। কেউ খেপালে আর খেপে না। ঠাট্টাপরিহাস ও আজেবাজে কোনো কথায় কান দেয় না। কেউ গালি দিলেও আর শোনেও শোনে না।
আমি বললাম, এটাই বুদ্ধিমানের কাজ। দুষ্টুরা দুষ্টামি কেন করে? উসকানি পায় বলে। ব্যর্থ হয়ে দেখবে আস্তে আস্তে সকলেই একদিন তোমার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হচ্ছেই।

অনেক দিন পর কাকা হরিণপালা নামের মর্মার্থ খুঁজে পেলেন। আমাকে ডেকে বললে আমি বললাম—কাকা, আমার জানা হয়েছে।
কাকা অবাক হয়ে বললেন, কিভাবে?
আমি বললাম, কিত্ত থেকে।
কাকা ত আরো আশ্চর্য হয়ে গেলেন—কিত্ত এসব জানে?
আমি বললাম, জানে। তার পরদাদাদের অনেকে নাকি শিকার করতে খুব ভালবাসতেন। এখানে তখন গভীর জঙ্গল। দিনের বেলায়ও শিয়াল ডাকত। বাঘভাল্লুকের ডাকও নাকি মাঝের মধ্যে শোনা যেত। গভীররাতে হাতির পাল নেমে আশেপাশের বাড়িঘর তছনছ করে চলে যেত। হাতির ভয়ে অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতেও বাধ্য হয়। যারা মাটির টানে যেতে পারেনি তারা চার দিকে বড় বড় মশাল জ্বেলে গাছে ঘুমাত। ওসব আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হতে হতে একসময় আবাদ শুরু হয়। তখনো বেশ হরিণের ঝাঁক দেখা যেত। শিকারিরা বন্ধুবান্ধব নিয়ে বড়ই আনন্দে শিকার করত—হরিণ খরগোশ ধলাবক বনমোরগ কাকাতুয়া বনঘুঘু এসব নানান পশুপাখি। একদিন কিত্তের পরদাদাদের একজন হরিণপালে বন্দুক তাক করলে সব হরিণ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু একটিমাত্র হরিণ শিকারের মুখে নিশ্চল—একদৃষ্টে দাঁড়িয়ে ‘টপ’ ‘টপ’ করে চোখের পানি ফেলতে থাকে! শিকারি অঘটন এ দৃশ্য দেখে সঙ্গে সঙ্গে বন্দুক নামিয়ে ফেলে। তবু হরিণটি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শিকারিজন আস্তে আস্তে কাছে গিয়ে হরিণটিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে এবং পেটেপিঠে হাত বুলিয়ে অনেক আদর করে দেয়। হরিণটি ছিল গাভিন। এক্ষুনি বিয়াতে পারে এমন একটি পোয়াতি হরিণী। প্রসববেদনায় মনে হচ্ছে খুবই ব্যথিত। তারপর কিত্তের এ পরদাদা এ জায়গায় বড় করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয় এবং বড় বড় অক্ষরে লিখে দেয় : এখানকার হরিণগুলো পালা—এখানে যেকোনো পশুপাখি শিকার করা নিষেধ। তারপর ধীরে ধীরে এ জায়গার নাম হয়ে ওঠে ‘হরিণপালা’।
কাকা আশ্চর্য হলেন এবং বললেন, কিত্ত ত দেখছি অনেকের থেকেও আরো বেশি তথ্য জানে!

কৃতার্থের যাটুকু সম্পদ বাকি ছিল ক্রমান্বয়ে অইটুকুও দান করে দিয়েছে মসজিদ-মাদ্রাসা ও স্কুলকলেজের জন্যে। বেশ কয়েকটি ছোটবড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার দেওয়া জায়গার উপর গড়ে ওঠে। বলতে গেলে তখন একেবারে নিঃস্ব সে। একদিন আমাকে বলল ‘দাদা’ আমার অনুরোধে আমাকে আর ‘সাহেব’ বলে না—এ জীবনটা খুবই ছোট তাই বড় জীবনের জন্যে কিছু করে যেতে পারলেই সম্পদশালী। সম্পদ দিয়ে পাপও কেনা যায় আবার পুণ্যও কেনা যায়। যারা পাপ কিনে তারা ধনী হয় বটে তবে ধন্য নয়, যারা পুণ্য কিনে তারা ধনী ও ধন্য দুনোটাই হয়। আমার পূর্বপুরুষেরা ধনী ত ছিল, সম্ভবত ধন্য হতে পারেননি। তাই ধনীর চেয়ে ধন্যটা কামাই করাই ছিল আমার লক্ষ্য।
আমি বললাম, তোমার কথা যুক্তি আছে তবে বন্ধু তোমারও ত একটা জিন্দেগি আছে, তোমার এ জীবনের জন্যে কিছুই যে একেবারে রাখলে না!
কৃতার্থ একটু হেসে বলল, দাদা, আপনি আমার অনেক বড় হবেন, জ্ঞানেগুণেও আপনাকে অনেক বড় মনে করি।
আমি হেসে বললাম, অনেক বড় নয় কিছুটা হতে পারি আর কি। তবে ভাই জ্ঞানেগুণে তোমার থেকেও খুব ছোট মনে করি নিজেকে। দুনিয়াসম্বন্ধে তোমার ভালো জ্ঞান আছে।
কৃতার্থ লজ্জার হাসি হেসে বলল, লজ্জা দিবেন না দাদা, আমার সঙ্গে আপনার তুলনা হয় না। আর রইল বিষয়ের কথা, এসব বিষয়াদি কিসের জন্যে? নিশ্চয় সংসারের জন্যে। কিন্তু সংসারের প্রতি ত আমার কোনো মায়া নেই। আমি প্রায়ই আধ্যাত্মিক কিছু স্বপ্নে দেখি। তাঁরা আমাকে আদেশ করে। আমি তাঁদের আদেশমতো চলতে পারছি না বলে নিজের উপর দুঃখ হয়।
আমি আশ্চর্য অনুভব করে বললাম, আধ্যাত্মিক! সেই ত বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার। তুমি এমন কিছু যদি স্বপ্নে দেখে থাক, তা হলে ভুলেও কাউকে এব্যাপারে কিচ্ছু বলো না এবং ওঁদের কথামতো চলো আর সাধনা করে যাও। সত্যিকারের সাধনায় আল্লাহ্‌কেও দেখা সম্ভব। হয়ত এজন্যে তোমার অই দরোজাটা বন্ধ হয়ে আছে। তবে আমার জানামতে, সংসার বাদ দিয়ে ত এসব ফলের আশা করা যায় না।
কৃতার্থ বলল, আপনার কথা হয়ত ঠিক তবে তার আশাও যে আমি করি নে।
এরকম টুকটাক কথাবার্তা বা আলাপসালাপ প্রায় সাক্ষাতে হয় এবং হতো। তার সঙ্গে কথা বলে যে একটা মজা বা আনন্দ পাওয়া যেত আর কোথাও সেটা অনুভব হতো না। তাই ধীরে ধীরে তার প্রতি আমিও আকৃষ্ট হই।

বেশ কিছু দিন কেটে যাওয়ার পর। একদিন গ্রামে হঠাৎ তুমুল হইচই—সবার মুখে মুখে এককথা, কিত্তকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে! কিত্তকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে! শোনামাত্র আমি আকাশ থেকে যেন পড়লাম। খোঁজখবর নিয়ে জানলাম খুনের দায়ে কৃতার্থ গ্রেপ্তার হয়েছে। আমি আরো আশ্চর্য হলাম—খুন! একাজ কি কৃতার্থ করতে পারে? এবার কোন্ থানায় আছে সেটার খোঁজখবর নিলাম। কাউকে কিছু না জানিয়ে চুপিচুপি সেখানে গেলাম—দেখলাম, কৃতার্থ লাচার—মা মরা এক শিশুর মতো হাজতে বসে কাঁদছে। আমাকে দেখে দুনিয়ার শোক যেন তার ফেটে পড়ছে। আমি পুলিশের অগোচরে ঠোঁটে ঠোঁটচেপে চোখের ইশারায় বুঝালাম চুপ থাকতে। পুলিশ আমার কাছে জানতে চাইল তাকে আমি কতটুকু চিনি। আমি পুরোপুরি নয় তবে একটু অচেনার ভান করলাম : চিনি তবে এতটুকু—গ্রামে সবাই তাকে পাগল বলে জানে। তারপর পুলিশ আমাকে দারোগার রুমে নিয়ে যান। দারোগা—আমার নাম কী, আমি কী করি না করি আমার সম্বন্ধে সবকিছু জানতে চাইলেন। কৃতার্থের সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানার আগ্রহ দেখালেন না। কারণ জানি, তাঁদের কাছে অপরাধ কোনো কতূহলের বিষয় নয় এবং অপরাধী কোনো মর্যাদার পাত্র নয়। কথা বলার ফাঁকে জানলাম, যেই জঙ্গলের খাদে যুবতীর লাশ পাওয়া গেছে সেখান থেকে নাকি কৃতার্থ পালিয়ে যেতে তাকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে। আমি দারোগাকে বললাম, সাহেব, কী প্রমাণ পেয়েছেন সেটা তবে জানতে পারি?
দারোগা বললেন, প্রমাণ কী পেয়েছি সেটা বড় কথা নয়।
আমি বললাম, তা হলে?
দারোগা বললেন, বড় কথা হচ্ছে—দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া এবং এলোমেলো কথা বলা কি অপরাধের লক্ষণ নয়?
আমি বললাম, আমি যদি বলি—এ ছেলে খুন করবে ত দূরে থাক, রেপই ত করতে পারে না।
দারোগা চমৎকৃত হয়ে বললেন, একথা তুমি জোর দিয়ে কিভাবে বলতে পারো?
আমি ইতস্তত না করে বললাম, এ ধর্ষণ ও খুন আমি করেছি। একথা শুনার পর সকলে আমার দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলেন। দারোগা আরো চমৎকৃত হয়ে বললেন, তুমি! ‘ধর্ষণ’ স্বাভাবিক বলা যায় কিন্তু খুন কেন?
আমি বললাম, কেনর কোনো সঠিক জবাব একজন অপরাধীর কাছে আশা করা ভুল।
দারোগা বললেন, তোমাকে দেখে ত তা মনে হয় না।
আমি বললাম, চোখে যা দেখা যায় কখনো কখনো তা মিথ্যাও হয়। সজ্জনেরাও যে সব সময় সততায় চলে এমন কথা ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক। দয়া করে কৃতার্থকে ছেড়ে দিন। তবে আমাকে একটু ওর সঙ্গে কথা বলতে দিন। শুধু একটা কথা বলব। অনুরোধ গ্রাহ্য হলো।

আমার আত্মসমর্পণের এক দিনপর কৃতার্থ ছাড়া পেল। আমার মানা সত্ত্বেও কাকাকে গিয়ে বিস্তারিত জানাল। কাকা সবকিছু জেনে ছুটে এলেন আমাকে দেখতে কিন্তু দেখা করতে পারলেন না। জিজ্ঞাসাবাদের সপ্তাখানেকপর কাকার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। আমার চেহারা দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না—কেঁদে বললেন, তোর জন্যে আমি পাগল হওয়ার পথে। এ কী করলি তুই?
আমি কাকাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম—কাকা, কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসে পরের উপকারের জন্যে। কিছু মানুষ নিজের প্রয়োজনের বাইরে এক পা বাড়ায় না। তবে কিত্ত এমনই একজন মানুষ, যে শুধু দিতে শিখেছে নিতে নয়। আমি জানি কিত্ত নির্দোষ।
কাকা ধমক দিয়ে বললেন, হতে পারে কিত্ত নির্দোষ তবে তুই কি দোষী? আফসোস করে বললেন, অরে বোকা, তোর এ পাগলামির সাজা কী জানিস? মানলাম কিত্তের কাছে তুই ঋণী। তাই বলে কি…
আমি বললাম—কাকা, এঋণ যদি নাও থাকত তবু আমি কিত্তের মতো মানুষের জন্যে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে ছুটে আসতাম।

আমার দুটো কিডনির অচলতা ধরা পড়ার পর আমারই অজান্তে কৃতার্থ আমাকে তার একটি কিডনি দান করে যে, আমাকে চিরঋণী করছে তা নয়, বড় মনের যে পরিচয় দিয়েছে সেটাই আমার কাছে বড় বিষয়। এমন দানের ঋণ জীবন দিয়েও কি শোধ করা যায়? যায় না। আমার কান্না তবে ভেতরে ভেতরে স্রোতস্বি নদীর মতো প্রবাহিত হচ্ছে—কাকাকে দেখাচ্ছি হাসিমুখ।

কাকার নিযুক্ত বড় বড় উকিলেরা অনেক চেষ্টা করলেন, আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারলেন না। আমি দোষী সাব্যস্ত হলাম এবং রায়ে আমার ফাঁসি হলো। কাকা আমাকে কন্ডেম সেলে দেখতে এলেন। সঙ্গে নাকি কাকিমা, ঝিনুক, ঝিলিক ও রিহানও এলেন। তবে তাঁদেরকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।
অনেক কথা বলার পর কাকা বললেন, আজ তোর মা-বাবা এক জনই যদি জীবিত থাকত কী জবাব দিতাম আমি ইত্যাদি বলে অঝরে কাঁদলেন। অভিমান করে চলে যেতেই আমি শান্তকণ্ঠে কাকাকে বললাম—কাকা, পৃথিবীটা যতই ছোট হয়ে আসছে, তারচেয়ে আরো বেশি ছোট হয়ে আসছে মানুষের জীবন। এ ছোট্ট পরিসরে যদি মানুষ বড় কিছু করে যেতে পারে তবেই জন্ম সার্থক।
কাকা ভীষণ দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, আমার বড় ভুল হয়েছে তোকে আমার বাড়িতে আনা।
আমি বললাম, কাকা দুঃখ কেন করেন, ভাগ্যে কাকে কোথায় নিয়ে যায় এবং কাকে কোথায় এনে দাঁড় করায় একমাত্র ভাগ্যধাতাই ত ভালো জানেন আর তিনি যা করেন তা ত সৃষ্টির মঙ্গলের জন্যেই করেন।
কাকা সস্নেহে—আমাদেরকে মাফ করে দিস, আমরা তোর জন্যে কিছুই করতে পারলাম না বলে কেঁদে চলে গেলেন।

আজ বৈশাখের দ্বিতীয় দিন। আজ আমার ফাঁসি—বেলা বারোটা একমিনিটে। সকালে কাকিমা ও ঝিনুক এলেন আমাকে দেখতে। কাকা নাকি অসুস্থ তাই আসতে পারেননি। ঝিলিক ও রিহান আসতে চেয়েও আসেনি, কারণ কন্ডেম সেলে এতজন ঢুকার অনুমতি নেই। অনেকক্ষণ কথাবার্তা বলে ঝিনুক ও কাকিমা কেঁদে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর দেখি তুমুল ঘণ্টাবাজি—পুলিশের ছুটোছুটি আর দৌড়াদৌড়ি! একজন পুলিশকে ডেকে জিগ্যেস করলাম, কী হয়েছে? সে মুখমুচড়ে দেয় দৌড়! হুইসিল ও ঘণ্টার আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই কানে আসছে না! নাজানি কী অঘটন ঘটল—মনে মনে ভাবছি। জেলভেঙে মনে হচ্ছে কোনো আসামী পালিয়ে গেছে। এখানে মানুষ সুখের চেয়ে বেশি দুঃখটাই ভোগ করে। আনন্দের চেয়ে বেশি বেদনার কথাটাই বলে। প্রাপ্তির চেয়ে তবে হারানোটাই যার বেশি তার জীবন ধন্য হয়। আজ নিজেকে খুব ধন্য মনে হচ্ছে। গাছেগাছে পাখিদের কলকলানি। মাঠেঘাটে ফুটবে যে নানান ফুল। হাটখোলা রথখোলা মানুষের মিলনমেলা এ অপূর্বতার পৃথিবীটা যদিওবা আমার আর দেখা হবে না। কয়েকঘণ্টা পর আমার ফাঁসি।

আমার শেষইচ্ছার কথা জানতে চাওয়া হলে বললাম, কোনো খোলা ময়দানে প্রকাশ্যে আমাকে ফাঁসি দেওয়া হোক। কেন জানতে চাওয়ার আগেই বললাম, কী অপরাধে আমার ফাঁসি হচ্ছে তা সাধারণ মানুষজনে দেখুক এবং দুনিয়ায় মানুষজনে জানুক। তারথেকে যদি অপরাধপ্রবণতা কিছুটা কমে তা হলে আমার মৃত্যু সার্থক। এই প্রথম দেখছি অপরাধীর জন্যে পুলিশের চোখে পানি।

আমার ফাঁসি হচ্ছে কিন্তু জানা যাচ্ছে পাটাতন কিছুতেই সরছে না! আমাকে আবার কন্ডেম সেলে ঢুকানো হলো। আবার আদালত থেকে দিনক্ষণ ধার্য করা হলো। আবার আমার শেষইচ্ছার একই কথা জানানো হলো। আবার আমার ফাঁসি হচ্ছে এবং আবার সেই একই পরিণতি ঘটচ্ছে—পাটাতন কিছুতেই সরছে না! আবার আমাকে কন্ডেম সেলে ঢুকানো হয়। এভাবে বারেবারে তিন-তিনবার আমার ফাঁসির হলো, তিন-তিনবারই ব্যর্থ হলো! এবার দেশজুড়ে আরো জোরালোভাবে বিতর্কিত শুরু হলো। আলোচনার পর আলোচনা, বৈঠকের পর বৈঠক এবং মিছিলের পর মিছিল—চার দিকে হইছই আর সোরগোল—এই ফাঁসি রুখতে হবে। এমন সময় শোনা গেল—আসল খুনিদের ধরা হয়েছে! খুনিরা স্বীকার করেছে গ্যাংরেপ ও এধরনের আরো কয়েকটি খুনের কথা। তবে একজন এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তাকে ধরা হলে মামলার একটা সুরাহা হয়—হবে। ঝিনুক এসে সব জানিয়ে গেল। এরমধ্যে সে ল পাশ করে আদালতে যোগ দিল।

আজ ঝিনুক আমাকে দেখতে এসে এমন কান্না কেন করল জানি না। এরকম কান্না আর কখনো করেনি সে। জিগ্যেস করলাম, বাড়িতে কিছু হয়েছে কি? দেখি কিছুক্ষণ নীরব রইল সে, উত্তরে কিছুই বলল না। একটু পর একটা ফাইল বের করে দিয়ে বলল, সাইন করে দিন। এই মামলাটা এখন থেকে আমি চালাব।
আমি সাইন করে দিয়ে বললাম, কপালে যা আছে ঘটবে—ঘটুক, কপালরেখা ত খণ্ডানো যাবে না ঝিনুক।
ঝিনুক বড় বড় চোখ করে অভিমানীকণ্ঠে বলল, আপনি কী করেছেন আপনি জানেন? কপালের দোষ দিচ্ছেন কেন?
আমি একটুখানি হেসে বললাম, ভালো কি মন্দ জানি না তবে কারো উপকার করা নিশ্চয় মন্দের কাতারে পড়ে না। ঝিনুক এমনভাবে আমার দিকে চেয়ে থাকে—পারলে আমাকে গিলে খায়। তার চোখেমুখে এমন অভিমান আর কখনো দেখিনি। এ আচরণকে কে কোন্‌ চোখে দেখে জানি না, বাইরে থাকলে নিশ্চয় কেউ না কেউ অন্যচোখে দেখত। আজ তার প্রতি আমারও এত কেন মায়া হচ্ছে জানি না। এ প্রথম কোনো মেয়ের জন্যে আমার মনের ভিতর এমন তোলপাড়। এটাকে কে কি বলে বা মনে করে জানি না। কানাঘুষায় যাঁরা অন্যপথ খুঁজে তাঁরা হয়ত ভুল করে তবে বোকামি করে না নিশ্চয়।

জেলে আজকাল নিয়মিত ঝিনুক আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। মাঝে মাঝে কাকিমা ও ঝিলিক আর রিহানও একসঙ্গে আসে। তাঁদেরকে কাকার কথা জিগ্যেস করলে কাকিমা বলত, ভালো আছে। ঝিনুককে সব সময় জিগ্যেস করতাম, কাকা কেমন আছে? রাগ করে বোধহয় আমাকে দেখতে আসে না। কাকার কথা বলতেই ঝিনুক আর কান্না ধরে রাখতে পারত না। লোহার জাফরির ছিদ্রে ধরা আমার আঙুলের ভাঁজের হাতদুটো চেপে ধরে প্রায়ই ফুঁপিয়ে কান্না করত!
আমি সব সময় আশ্চর্য হয়ে বলতাম, কী হয়েছে খুলে বলবে ত? ঝিনুক কিছুই খুলে বলত না, পরে বলবে বলবে করে সব সময় চলে যেত। আমারও সব সময় কাকার জন্যে খুব প্রাণ কাঁদত। কিরকম অসুস্থ জানি না। দীর্ঘদিন থেকে শোনছি, অসুস্থ অসুস্থ। ঝিনুকের কান্নাও প্রায় কিরকম মনে হতো।

কিছু দিন পর ঝিনুক আমাকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনল। জেলগেটে হাজার হাজার মানুষের ভিড় দেখে আমি রীতিমতো অবাক হলাম। আমাকে একনজর দেখতে আসে তাঁরা! আমি যেন আজ পৃথিবীর এক অন্যমানুষ। এঁদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। এঁদের অনেকেই নাকি আমার জন্যে আন্দোলন করেছে জানলাম। আমি বুকে হাত রেখে সকলের উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। আমাকে ছাড়িয়ে আনার পিছনে, অবশ্য এটা পুরোপুরি ঝিনুকের কাবিলিয়ত বলা যায় না বা যাবে না। প্রথম কারণ—অলৌকিকতা। দ্বিতীয় কারণ—খুনিদের ধরা পড়া। তৃতীয় কারণ—অনেকের মানববন্ধন ও পেপারপত্রিকায় লেখালেখি এবং মিছিলমিটিং। নাহলে নিজের মুখে স্বীকার করে নেওয়া এমন জঘন্য অপরাধের ক্ষমা কি হয়? হয় না। ঘরে এসে দেখলাম কাকা নেই! মনে হলো আমার সঙ্গে রাগ করে বোধহয় আমার আসার খবর শোনে বাইরে চলে গেছে। আসুক, এলে হাতেপায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে নেবো। সবাই আমাকে ঘিরে আছে। এমন সময় দেখি কৃতার্থ আসছে, এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কান্নাকাটি করছে। পুলিশের ভয়ে নাকি সে আমাকে জেলে একবারও দেখতে যায়নি। সব সময় তবে খোঁজখবর নিয়েছে। কথায় কথায় হঠাৎ বলে ফেলল কাকার মৃত্যুর কথা। সে মোটেই জানে না আমার কাছ থেকে কাকার মৃত্যুর খবর গোপন রাখা হয়েছে। আমি কেঁদে—বিশেষ করে কাকিমা ও ঝিনুককে উদ্দেশ্য করে বললাম, এত বড় একটা ঘটনা আমাকে জানানো হলো না কেন?
কাকিমা কেঁদে বললেন, আমি একটা দুঃসময়ের মধ্যে দিন কাটছি সেখানে আরেকটা দুঃসংবাদ মোটেও বলা উচিত নয়।

জেল থেকে এসে কৃতার্থ এমন আল্লাহ্‌ওয়ালা হয়ে গেছে শোনে ভালো লাগল। মনে মনে বলছি—যাক, এবার একটাকিছু সে হলেও হয়ে যেতে পারে। কাকার ব্যবসার সমস্ত দায়িত্বভার আমার ‘না’ বলা সত্ত্বেও কাকিমা আমার হাতে তুলে দিলেন। এদিকে ঝিনুকের বিয়ের প্রস্তাবে বাড়ির রাস্তার ঘাসপ্রায় মরো মরো। ঝিনুক ‘না’ ‘না’ করতে করতে হয়রান।

একদিন—বছরখানেক পর দেখি কাকিমা আমার ঘরে এসে ঢুকলেন! আমি অবাক। বললেন, কিছু মনে করো না বাবা।
আমি না বুঝেও বললাম, না না।
কাকিমা বললেন, আজ তোমার চাচা বেঁচে থাকলে বোধহয় সবচেয়ে বেশি খুশি হতো। তোমাকে এত বেশি সে ভালবাসত—আমাদের তিন-তিনটি ছেলেমেয়ের মতো। তোমার চিন্তায় চিন্তায় সে আরো বেশি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল।
আমি কিছুই বুঝে ওঠতে পারছি না, কাকিমা ঘুরেফিরে কী বলতে চাচ্ছেন। দেখি, অনুরোধ করে যা বলছে রীতিমতো অবাক হওয়ারই মতোই কথা! বাবা, তুমি ‘না’ বলো না—ঝিনুক তোমাকে ছাড়া দুনিয়াতে কিচ্ছু বুঝে না। ঘরে ঘরে জিনিসটা সুন্দর দেখাবে না ঠিক, তবে আমার চলে যাওয়ার পর আমার মনটা অস্থির থাকবে—তিনটে ছেলেমেয়ের জন্যে। তুমি যদি ঝিনুককে বিয়ে কর তা হলে এটা অনেকটা ঘুচতে পারে।
আমি আর কী বলব, সুন্দর-অসুন্দরের কথা সবগুলোই ত কাকিমা বলে দিয়েছে। তবু একটু চিন্তা করে বললাম, ঠিক আছে। কিন্তু আমার একটা আপত্তি আছে—আমি এঘরে বিয়েটা করতে চাই না; অন্য কোথাও একটা বাড়ি করে তারপর।
কাকিমা বেশ খুশি হয়ে বললেন, সেই ত আরো সুন্দর কথা। আমার আর কোনো দুঃখই থাকল না। এখন মরলেও শান্তি পাব। তিনটি ছেলেমেয়ের দায়িত্ব তোমার উপরই থাকল বলে কাকিমা উপরে উঠে গেলেন।

আরো প্রায় এক বছরের মতো হয়ে গেল, হরিণপালা ছাড়িয়ে আমাদের বাড়িটি শাঁখারিঘাটে জমি কিনে তৈরি করতে। ঝিনুকের মনের মতো করে বাড়িটি তৈরি হলো। তারপর আমাদের বিয়েটাও হয়ে গেল। এবাড়িতে কৃতার্থ সব সময় আসা-যাওয়া করছে। এরমধ্যে একদিন বলল—দাদা, আমি হয়ত অন্যকোথাও একদিন চলে যাব এবং যেতেই হবে। আমার বাড়িটা তখন কোনো অসহায়কে দিয়ে দিয়েন।
আমি অবাক হয়ে বললাম, সেই কেন আর কেন যেতে হবে? এখানে তোমার সমস্যা কী?
কৃতার্থ বলল, সমস্যা কিছু নেই তবে আমাকে প্রায়ই স্বপ্নে আদেশ করে অন্যখানে চলে যেতে।
আমি আরো আশ্চর্য হলাম এবং বললাম, একথা আর কাউকে বলো না।
কৃতার্থ বলল, দুনিয়াতে মানুষ কে, যাকে এমন কথা বলা যায়।
আমি বললাম, হাঁ হাঁ—এমন কথা একদম কাউকে বলা ঠিক না। একদম বলো না। সেও একদম ‘না’ বলে চলে যায়। ঝিনুক চা-নাস্তার প্লেট নিয়ে যেতে এসে দেখল কৃতার্থ নেই! আমাকে জিগ্যেস করার আগেই আমি বললাম, একটু তাড়া আছে তাই সকাল সকাল চলে গেল আজ।
ঝিনুক বলল, ভাতটা খেয়ে গেলে ভালো হতোনা। তুমি হয়ত বললেই না।
আসলেই আমি ভুলে গিয়েছিলাম আজ তা বলতে! কৃতার্থের কথায় এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে, ভাতের প্রসঙ্গটা আমার মনেই ছিল না।

কয়েকদিন পর ঝিনুকদের বাড়ি গিয়ে শোনলাম কৃতার্থ নেই। মনে মনে ভাবলাম—হঠাৎ! এমন ত মোটেও ভাবিনি। তার কথায়ও ত এমন জানা যায়নি। যাই হোক, যেখানে যায়-যাক ভালো থাকুক। তার জন্যে খুব প্রাণ কাঁদল। শেষ দেখাটা আর হলো না। বাড়ি এসে ঝিনুককে কিছু বলিনি। মন খারাপ কেন সে বারবার জিগ্যেস করল। বললাম-না, কিছু হয়নি একটু অস্বস্তি লাগছে।
ঝিনুক অস্থিরগলায় জিগ্যেস করল, মা, ঝিলিক ও রিহান ভালো আছে ত?
বললাম, তারা খুব সুস্থ আছে। কৃতার্থের ব্যাপারে আর কিছু জিগ্যেস না করে রান্নাঘরে গিয়ে আমার জন্যে চা নিয়ে এসে বলল, আমিও কয়েকদিন পরে মাকে একটু দেখতে যাব।
আমি বললাম, তা হলে আজ আমার সঙ্গে গেলে না কেন? গেলেই ত পারতে?
ঝিনুক বলল, তুমি গিয়েছ কাজে। কাজে বেড়ানোটা কি যায়?
আমি বললাম, আমি চলে এলে তুমি থেকে যেতে।
সে আর কিছু বলল না, শুধু বলল একটু যাব।
আমি বললাম, যেয়ো। তারপর ব্যবসার কাজে আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম। ওকথা আর মনেও নেই। দুয়েকদিন পর অফিসে হঠাৎ তার ফোন! সচরাচর অফিসে সে অনর্থক ফোন করে না। সব সময় রাত একটু দেরিতে ফিরি বলে আমার সঙ্গে ঘরে তার তেমন একটা বেশি কথাবার্তাও হয় না। এই নিয়ে কোনো অভিযোগও তার নেই। সেও আদালত নিয়ে বেশ ব্যস্ত থাকে।
বলল, মার সঙ্গে ফোনে আজ কথা হলে জানা যায় ওঁ খুব অসুন্থ। এদিকে আমারও ত প্রায় দুই-তিন মাস হচ্ছে মাকে দেখিনি—আজ একটু যাব।
আমি বললাম, যাও।
সে বলল, আজ কিন্তু আসব না! সবগুলো রান্না করা থাকবে, তুমি এসে একটু গরম করে খেয়ে নিয়ো। আচ্ছা রাখি। ‘রেখ’ বলে আমিও রেখে দিই।

তার পরের দিন ঝিনুক অবশ্য তাদের বাড়ি থেকে চলে এল। আমি অফিস থেকে এলে তাড়াহুড়ো করে বলছে—সিদ্ধার্থ, শোনছ? কৃতার্থ নাকি কোথা চলে গেছে!
আমি বললাম, জানি।
সে আশ্চর্য হয়ে বলল, জানো! তা হলে আমাকে বললে না যে?
আমি হেসে বললাম, তুমি আমি জানলেইবা কী আর না জানলেইবা কী। যেকাজে বা কথাতে কোনো লাভ নেই তা নিয়ে আফসোস করা কিবা মাথাঘামানো বোকামি। যে যায় সে আর ফিরে আসে না।
ঝিনুক গম্ভীরগলায় বলল, তার পরেও…আমার কি একটু জানার অধিকার ছিল না।
আমি আর তাকে কী দিয়ে সান্ত্বনা দেবো বুঝতে পারলাম না—বললাম, তোমাকে আসলে ‘বলব’ ‘বলব’ করে ভুলেই গিয়েছিলেম! তুমি চিন্তা করো না, কোথায় গেছে বা আছে অন্তত আমাকে জানাবে; তখন দুজনে গিয়ে একদিন দেখে আসব। কৃতার্থের জন্যে ঝিনুকের এতবেশি দরদ দেখানোর আরো একটা কারণ আছে, কৃতার্থ তাকে ধর্মের বোন বলে মানতো। ঝিনুকও সেহিসেবে তাকে সমাদর করত।
১০
প্রায় দশ বছর হতে চলছে, আমাদের সাংসারিকজীবন অতিবাহিত হচ্ছে। এরমধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেছে। ঝিলিকের বিয়ে অতি ধুমধামে হয়ে গেছে। আমাদের দুই-দুটো ছেলেমেয়েও হয়ে গেছে। কাকিমা মাও পরপারে চলে গেছে! রিহানকে কাকার ব্যবসাবাণিজ্য বুঝিয়ে দিয়ে সাংসারিক করাও হয়ে গেছে। সময় এত দ্রুত চলে যাচ্ছে—টেরও পাওয়া যাচ্ছে না। কাকিমার মৃত্যুর পর হরিণপালাও যাওয়া-আসা আমাদের একপ্রকারের বন্ধের মতো হয়ে গেছে। এই নিয়ে রিহানের আক্ষেপ খুব কাটে। সেও আজ বেশ সংসারী হয়ে গেছে। ওদিকে ঝিলিকও ব্যারিস্টার স্বামী ও বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় পার করছে। সবাই যার যার সংসার ও কাজ নিয়ে (সুখে হোক বা দুঃখে) ঝমেলাঝক্কিতে পড়ে আছে বা পড়ে গেছে। কে কার কথা মনে করবে। সংসার এমন এক জিনিস—দিন পেরুলে রাত, রাত পেরুলে দিন এভাবেই ত চলছে সংসারের চক্রটি। আমরা কিন্তু কৃতার্থের কথা ভুলিনি।

দোসরা ফাল্গুন, ঝিনুক আজ একটু ঘটা করে আমার জন্মদিনটা পালন করবে এবং করতে চায়। সবাইকে এই উপলক্ষ্যে একটু কাছে পেতে চায়। এরমধ্যে আর কোনো দিন আমার জন্মদিন পালন করা হয়নি। আমি বললাম ‘না’ জন্মদিনকে ঘিরে এমন আহামরি ঠিক না। যে ক্ষণস্থায়ী তার কোনো স্থায়ী আনন্দ নেই। এই নিয়ে আমাদের মধ্যে কথাবার্তা চলছে, এমন সময় দেখি একটা চিঠি নিয়ে এল এক বয়স্ক লোক! আজকাল চিঠির যুগ চলে গেলেও কারো কারো ক্ষেত্রে চিঠিটাই একমাত্র মাধ্যম হয়ে আছে। খামের উপরে আমার ঠিকানা লেখা। প্রেরকের কোনো নামধাম ও ঠিকানা নেই। চিঠিটা ঝিনুককে খুলতে দিলাম। চিঠিটা খুলে ঝিনুক যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল। কৃতার্থের চিঠি! ঠিকানা ও বিস্তারিত লিখা—সেই পুরোনো ‘দাদা’ সম্বোধন। মানুষ যত বড় হয়ে যাকনা কেন, পুরানো কথা বা স্মৃতি—কোনো কৃতজ্ঞতা ভুলতে নেই। ভুলে গেলে সে আর সঠিক মানুষের পর্যায়ে থাকে না।

ঝিনুক আর আমি একটা সময় ঠিক করে কৃতার্থকে দেখতে গেলাম। সেই অনেক দূরে, রায়নগর একটা পাহাড়ে। দেখলাম এবং দেখে মনে হলো, তার এই কর্মকাণ্ড প্রকাশ করতে গেলে আরেকটা গল্প হয়। কৃতার্থ আজ আউলিয়াদের একজন। তার হাজার হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ মুরিদান বলা যায়! আমাদের খাতিরদারি দেখে অনেকের ফিসফিসানি ও কানাকানি বুঝা যাচ্ছে, ইনারা আবার কে? ঝিনুকের অবর্তমানে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছে, ওঁকে ত কখনো এ দরবারে দেখা যায়নি! এমন সময় কৃতার্থ হঠাৎ বলে উঠল, ইনি আমার বড় ভাই। আপন না হলেও আপনের চেয়ে কম নয়।

আমাদের আসা বুঝতে পেরে খাস মুরিদানদের নাকি আগেই বলে দিয়েছে, মুসাফিরদের থাকার দক্ষিণের চার কামরাবিশিষ্ট ঘরটা ছেড়ে দিতে; তার খাস মেহমান আসবে। সেখানে আমাদের জন্যে একটা কক্ষ এমনভাবে সাজানো হয়েছে, দেখে যেন মনে হলো কোনো রাজকক্ষ। আমার হুঁকো টানার অভ্যাস হয়েছে—দেখি সেভাবে হুঁকোও সাজান আছে! ঝিনুক মাঝের মধ্যে পান খায়, পানের বাটাও সাজানো আছে। সেখানে ঝিনুক আছে। আমি এখন (দিনের বেলা) কৃতার্থের সঙ্গে আছি। ঝিনুকের সঙ্গে কৃতার্থ দেখা করেনি, কারণ ঝিনুক বোনের মতো হলেও তার কাছে সে পরনারী আর পরনারীদের দেখা কোনো সাধুপুরুষের নাকি উচিত নয়। ঝিনুকও তাতে সন্তুষ্ট। তার এলাহি কাণ্ড দেখে ঝিনুক নিজেকে আজ অপরাধিনী মনে করছে, তাকে কখনো সে বুঝতে পারেনি এবং বিশেষ খাতিরদারি করতে পারেনি—এটাই তার আফসোস।

আমার সঙ্গে আলাপে ‘দাদা’ ‘দাদা’ ও ‘আপনি’ ‘আপনি’ করে যেই নস্রতা দেখাচ্ছে, অবশ্য সেটা আজ কোনোভাবেই তার মানায় না। আমারও লজ্জা এসে যাচ্ছে। আমিও ‘আপনি’ সম্বোধন করতে গেলে, আমার হাত চেপে ধরে—একি করছেন দাদা, আপনজন যতই বড় হোকনা কেন, কিন্তু আপনজনের কাছে কখনো বড় হয় না। আমাকে সব সময় ‘তুমি’ করে বলেছেন, আমাকে সব সময় তুমিই বলবেন—তাতে আমি খুশি।
আমি বললাম, এরকম জানলে আমি কখনো ঝিনুককে নিয়ে আসতাম না।
কৃতার্থ বলছে, ওঁ ত আমার বোন। আমার এখানে মেয়েলোকের আসা নিষেধ এজন্যে যে, তাঁরা কেউ ত আমার আপনজন না—সবাই ত তাঁরা আমার কাছে পরনারী। আপনারা ছাড়া আমার দুনিয়াতে আর আছেইবা কে।
আমি বললাম, এতই যখন আপনজন মনে করলে, তা হলে দশ বছরের মধ্যে একবারও যে জানাতে গেলে না?
সে বলছে, আসলে দাদা, এতটাই ধ্যানমগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম যে, দুনিয়ার কোনো খবরই আমার কাছে ছিল না। এই যে মুরিদান দেখছেন, কে কোত্থেকে এসে জুটেছে তাও আমি জানি না। আল্লাহ্‌র নামে যখন গুহায় ধ্যানমগ্ন হই তখন আমি একা আর ধ্যান ভাঙলে দেখি দুনিয়া। আমার ত মনে হচ্ছে—এক দিন আর আপনি বলছেন—দশ বছর!
আমি বললাম, এটাই অলৌকিকতা। তুমি আজ সার্থক।
সে সংকোচ করে আর কিছুই বলছে না। চোখ বন্ধ করে আছে দেখে আমিও চুপচাপ রইলাম। হঠাৎ চোখ খুলে বলছে, আমার বাড়িটি কাউকে দিলেন না। গরুমহিষ চরছে ভালো কথা।
আমি বললাম, এভাবে কি কেউ কারো সম্পদ দিতে পারে? তুমি নাহয়…বলতেই আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলছে, ঠিক আছে—ওখানে আমার কবর হবে।
কয়েকজন মুরিদকে ডেকে বলছে, আমার বাপদাদাদের ভিটেই যেন আমার কবর হয়। সব ব্যবস্থা দাদায় করবেন। তোমরা শুধু ওনার সঙ্গ দিয়ো।
মুরিদেরা তার পা ছুবে দূরের কথা, তার কাছেও দেখছি ঘেঁষতে পারে না! আমি মনে মনে বলছি, এত দিন হায়াতেজিন্দেগি যদি পাই…

কৃতার্থের অনুরোধে আমরা সেখানে সপ্তাখানেক থেকে যাই। এদিকে ঘরে ঝিলিককে রেখে যাওয়াতে নিশ্চিন্ত ছিলাম। ঝিনুকের মুখে কৃতার্থের গল্প শোনে ঝিলিক আর রিহান একেবারে পাগলপ্রায়—কৃতার্থের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে এবং তার কাছ থেকে দোয়া নেবে। ঝিনুক ও আমি ছেলেমেয়ে নিয়ে আবার যাব বলে আগ্রহ দেখালে কথা হয়—তখন তারাও সঙ্গে যাবে। বাদ সাধে ঝিলিকের ব্যারিস্টার স্বামী! সে এগুলো পছন্দ করে না এবং বিশ্বাসও করে না।
তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে আমি নরমগলায় বললাম, তোমার পছন্দ-অপছন্দ ও বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে তুমি তোমার জায়গাতেই থাক ভাই, তোমাকে বাধ্য করছে কে?
আমার কথার উত্তরে কিছু না বলে বলল, ঝিলিক যাবে না।
ঝিনুক বলল, ঝিলিক যাবে।
এই নিয়ে তুমুল কথাকাটাকাটির মধ্যে একসময় সে বলে ফেলছে—ঝিলিককে ত্যাগ করবে! ঝিনুক আরো গরম, এক্ষুনি ছেড়ে দাও। তোমার মতো পচা চিন্তাশীল মানুষেরা স্বামী হয়ে থাকার চেয়ে না-থাকাটাই ভালো। নিচুগলায় আরো বলল—এটাও জেনে রেখো, এমন ব্যক্তিদের সম্মানে আঘাত করলে পরিণতি কিন্তু করুণ হয়—মনে রেখো।
তার এমন রাগ আগে কখনো দেখিনি। ব্যারিস্টার আর কথা না বাড়িয়ে ঝিলিককে নিয়ে চলে যায়।

তার পরের দিন ঝিলিকের ফোন আসে, কেঁদে বলছে—ব্যারিস্টারকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে! আমরা ছুটে গেলাম। জানা গেল—হঠাৎ বুকের তীব্রব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে অমাত হয়ে মাটিতে শোয়ে পড়ে! তার ব্যাপারে কথা হচ্ছে—এমন সময় দেখি, নাস ও ডাক্তারদের ছুটোছুটি। জিগ্যেস করলে কেউ কিছু বলে না। মনে করলাম কোনো রোগির বোধহয় করুণদশা চলছে। দেখি না, তার ঘণ্টাখানেক পর একজন নাসের সঙ্গে একজন ডাক্তার এসে বলছে, ব্যারিস্টার সাহেব আর নেই!
১১
হৃৎযন্ত্রের ক্রিড়া বন্ধ হয়ে ব্যারিস্টার সাহেব মারা গেছে—ডাক্তারদের কথা—এমন ঘটনা আজকাল প্রায়ই ঘটছে। আমাদের ধারণা তবে অন্যখানে। সেটা স্রষ্টায় ভালো জানেন। তার কুলখানিও শেষ হয়েছে। ঝিলিকের সংসারে শ্বশুরশাশুড়ি ও দেবরভাশুর বলতে কেউ নেই। ঝিলিকের স্বামীই মাত্র ছিল। ছোট ছোট ছেলে দুটো নিয়ে প্রায় একাই থাকতে হবে। সেদিক বিবেচনা করেই তাকে আমাদের এখানে নিয়ে আসা। এজন্যে রিহানও তার পরিবার নিয়ে এসেছে। রিহানের একটি মেয়ে হয়েছে, বয়স এখনও বছর পার হয়নি। আমাদের দুটো ছেলেমেয়ে—মেয়ের বয়স ছয় এবং ছেলের আট। ঝিলিকের ছেলে দুটোর বয়স—তিন ও পাঁচ। রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে সকলে হলঘরে বসে কৃতার্থের ওখানে যাওয়ার দিনক্ষণের আলাপ শেষ হয়েছে। পরের দিন রিহানের নাকি একটু কাজ আছে। তার পরের দিন যাওয়ার কথাবার্তা পাকা। কৃতার্থের ওখান থেকে আসা হয়েছে আমাদের প্রায় সপ্তাখানেক হয়েছে।

সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঝিনুকও সবকিছু সামলিয়ে প্রতিদিনের মতো এসে ঘুমিয়েছে। রাত প্রায় বারোটা, আমারও চোখে ঘুম এসে গেছে। ঘুমের ঘোরে নাকি আমি কী যেন বলছি আর কাঁদছি। ঝিনুক আমাকে ডেকে দিয়ে বলছে, কী হয়েছে? আমি নীরব, কী বলব ঝিনুককে। ঘড়ি দেখলাম—রাত তিনটা। ঝিনুকও অবাক—বলছে, এমন কাণ্ড ত আর কোনো দিন হয়নি। বারবার জিগ্যেস করছে, কী হয়েছে? কোনো দুঃস্বপ্ন?
আমি বললাম, হাঁ। তবে দুঃস্বপ্ন কি সুস্বপ্ন বলতে পারি না। পরশু নয়, কাল সকালে কৃতার্থের ওখানে যেতে হবে।
ঝিনুক এবার অস্থিরকণ্ঠে জিগ্যেস করছে, কী হয়েছে বলবে ত?
আমি স্থির হয়ে বালিশে হেলান দিয়ে বসে বললাম, রাতে স্বপ্ন বলা কি ঠিক হবে?
ঝিনুক বলছে, ওগুলো কথার কথা—বলা যাবে না কেন?
আমি ধীরে ধীরে বললাম, কৃতার্থকে স্বপ্নে দেখেছি। তার ওখানে আমরা গিয়েছি। এলাহি কারবার! লক্ষ লক্ষ লোকে তাকে ঘিরে আছে। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছি। আমাকে যেতে হবে।
ঝিনুক শোনে হেসে বলছে—ধুর, এটা একটা স্বপ্ন হলো। কৃতার্থ ভাই তোমাকে দেখা দিতেই পারে।
আমি বললাম, না। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছি কেন?
ঝিনুক আবারও হাসছে এবং বলছে—ধুর, বাদ দাও ত। স্বপ্নে মানুষ কত কি দেখে আর কত কি করে, স্বপ্ন নিয়ে এত দুশ্চিন্তা কিসের? ঘুমাও, সকালে দেখা যাবে।
ঘুমানোর অনেক চেষ্টা করছি কিন্তু ঘুম আসছে না। ঝিনুক ভালোই ঘুমাচ্ছে।

ভোর হয়েছে। আজানের আওয়াজ কানে ভেসে আসছে। ওঠলাম। ঝিনুককেও ডেকে দিলাম। তারপর আস্তে আস্তে সকাল হলো। সবাই ওঠেছে। চা-নাস্তা সেরেছে। রিহানকে বললাম, আজকে যদি কৃতার্থের ওখানে যায় তোমার বিশেষকোনো অসুবিধা হবে?
রিহান বলল, তেমন অসুবিধা নেই। তবে কেন? আগামী কাল যাওয়ার কথা-না?
আমি বললাম, যাওয়ার কথা ঠিক আছে কিন্তু আমার মন বলছে আজ যেতে।
রিহান আর কিছু জিগ্যেস না করে বলছে, তা হলে চলেন।
ঝিনুক আমাদের কথা শোনছে আর সঙ্গে সঙ্গে বলে দিয়েছে স্বপ্নের কথাটা।
রিহান বলছে—তা হলে ত যেতেই হয়।
ঝিনুক বলল, স্বপ্নের কথা তুইও বিশ্বাস করিস?
রিহান বলল, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা নয় আপা। যেতেই যখন হবে, তা হলে কাল আর আজকের মধ্যে পার্থক্য কি।
সকাল নয়টার দিকে রিহান, রিহানের স্ত্রী, ঝিনুক ও আমি গাড়িচেপে রওনা হলাম কৃতার্থের উদ্দেশ্যে। যেতে হবে প্রায় চার ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে। ঝিলিকের মন খারাপ, স্বাস্থ্যও তেমন একটা ভালো নেই। তার ছেলেদের খেলাধুলোর কথা চিন্তা করে, আমাদের সন্তানদুটোকে আবারও রেখে যাচ্ছি তার সঙ্গে ঘরে।

আমরা কৃতার্থের ওখানে পৌঁছলাম। আমাদেরকে দেখতে পেয়ে একঝাঁক মুরিদান ছুটে এলেন। আমি আর রিহান গাড়ির থেকে নামলাম। গাড়িতে ঝিনুককে আর রিহানের স্ত্রীকে বসে থাকতে বললাম। চার দিকে মানুষ আর মানুষের ভিড়! ব্যস্তছুটোছুটি! অনেক কান্নাকাটির আওয়াজও শোনা যাচ্ছে! একজন আমার কানেকানে বলছে, হুজুর নেই! ভিড় টেলে টেলে কৃতার্থের কাছে এসে পৌঁছলে শোনা যাচ্ছে তুমুল তর্ক। মুরিদানগণ দুদলে বিভক্ত। কেউ কেউ বলছে—ওনাকে এখানেই কবর দিতে হবে। কেউ কেউ বলছে—না, হুজুরের আদেশমতো পৈতৃকভিটাতেই দেওয়া উচিত। এমন সময় পুরো ছয় ফুটের (দাড়িচুলে একেবারে সাদা) এক জবরদস্ত দরবেশ এসে হাজির! চারি দিকে নীরবতা…সকলে চুপ…কানাকানিতে বুঝা যাচ্ছে ওনাকে কেউ এদিকে আর কখনো দেখেননি। কৃতার্থের মুখখানা একটুখানি দেখে বললেন, ওঁর কথামতো পৈতৃকভিটাতেই কবর হোক। ওনার বেশভূষণ ও চেহারা দেখে আর কেউ ‘না’ বলতে পারলেন না।

কৃতার্থকে পৈতৃকবাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এসে দেখি, এখানে ওনি (দরবেশজন) আগের থেকেই হাজির! এবার তিনি কৃতার্থের জানাজা পড়ালেন—পড়িয়ে বললেন, এটা হবে কৃতার্থ সাহেবের বাস্তবসমাধি আর ওখানে হোক ওনার স্মরণসমাধি। এই বলে মহাপুরুষজন ভিড়ের মধ্যে ঢুকে কোথায় বিলীন হয়ে গেলেন কেউই টের পাননি! এবার দেখি সকলে ওনার কথা নিয়েই ব্যস্ত—কৃতার্থ বলে গিয়েছে তার জানাজা পড়াতে এমন একজন লোক আসবে; তাঁকে যেন কেউ বিরক্ত না করে। ইনি কে হতে পারে? সকলে ওনাকে নিয়েই ভাবছে। আমি ভাবছি কৃতার্থের কথা, যে ছেলেটিকে মানুষ একদিন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে পাগল বানিয়েছিল, সে ছেলে আজ মানুষের মতো মানুষ বনে পৃথিবীর বাদশা হয়ে—পৃথিবীকেই কাঁদিয়ে গেল!

শ্রাবণ, ১৪২৫—চট্টগ্রাম

 

Name of author

Name: আযাহা সুলতান

৬ Replies to “হরিণপালা”

মন্তব্য করুন