ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব- ১  

প্রায়শ্চিত্ত

আধপোড়া একটি সিগারেটের জন্য পরপর তিনবার হাত বাড়িয়ে কিছুটা নিরাশ হয়ে নিচের দিকে নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে আছে ফজর আলী। আকমল সাহেব সিগারেটের শেষাবদি আনমনা ভঙ্গিতে টেনে যাচ্ছেন, উচ্ছিষ্ট অংশ মাটিতে ফেলে পায়ে দলে নিভিয়ে নিলেন।একটি চাপা অপমান বোধ ফজর আলীর গলা অবদি উঠে এসে আটকে রইল! ভাবছে কর্তার আজ হলো কি! গলা খেকারি দিয়ে পাশেই এক দলা থুথু ফেলল সে,চোখে পানি আসার উপক্রম হলে তা আটকে রাখতে এই কৌশল খুব কাজে লাগে। হঠাৎ ভারী গলায় আকমল সাহেব বলে উঠলেন,
কি রে ফজর ঘুম কি আজকাল তোর বেড়ে গেল নাকি?একটু খানি তোতলাতে তোতলাতে ফজর আলী বলল,
জে. জে.. না.. কর্তা
জাগনা পাইছি সক্কালেই তবে ছোডো আম্মার ফরমাইস খাটতে গিয়া দেরি হইয়া গেল।
আকমল সাহেব গর্জে উঠতে গিয়ে বরফ শীতলতা ধারণ করলেন,শুধু জানতে চাইলেন,
-কি ফরমায়েশ?
ফজর আলী বলল,
-জাল মানে জাল আনতে গেছিলাম পুকুর থেইক্কা মাছ তোলার জন্যে।
আকমল সাহেব পুকুর ধারে বাগানে যেখানে বসে ছিলেন সেখানেই বসে রইলেন,উঠতে গিয়েও উঠলেন না।
ছোড আম্মা হলো নবনীতা। আকমল সাহেবের দুই মেয়ে পারোমিতা আর নবনীতা।পারোমিতার বিয়ে হয়ে গেছে দশ বছর আগে আর নবনীতার পড়া শেষ হলো মাত্র । তিনি তাঁর এই ছোট মেয়ে টিকে ভয় পান জমের মতো! স্ত্রী মারা গেছে নবনীতার বয়স যখন সাড়ে তিন বছর।
আকমল সাহেব ঢাকার একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন, স্ত্রীর মৃত্যুর কয়েক বছর পরেই তিনি সব ছেড়ে ছুঁড়ে গ্রামে বাপ দাদার ভিটেমাটিতে বসবাস শুরু করেন। এখনো এখানেই আছেন।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় আগ্রহী ছিলেন না মোটেই।বড় মেয়ে কে কলেজে ভর্তি হওয়ার আগেই বিয়ে দেন কিন্ত ছোট মেয়ের সাথে পেরে উঠেননি।
ছোট মেয়ে নবনীতা আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে প্রাকটিস করছেন। নবনীতার প্রাকটিস পড়াশোনা ঢাকায় হলেও ছুটি ছাঁটায় গ্রামে বাবার কাছে চলে আসেন।
হঠাৎ নবনীতার গলা শুনতে পেয়ে আকমল সাহেব একটু নড়েচড়ে বসলেন,নবনীতা পুকুর ঘাটে বাগানের দিকেই আসছে, হাতে দু’টো চায়ের কাপ আর একটি ফ্লাস্ক।
-কি ব্যাপার বাবা?
চা খেতে বাড়ীতে ঢুকলে না যে!
সকাল থেকে একই জায়গায় বসে আছ তোমার তো পায়ের তলায় শিকড় গজিয়ে যাবে!
আকমল সাহেব এক গাল হেসে মেয়ের কথার জবাব দিলেন,
-খেয়াল ছিল না মা এত বেলা হয়ে গেছে!
ফরজ টা আবার কোথায় গেলো?
বেটা নচ্ছার! একটা সময় যদি তাকে হাতের কাছে পাওয়া যায়!
নবোনীতা বাবার পাশেই একটি চেয়ার টেনে বসে কাপে চা ঢালতে ঢালতে বললেন,
ফজর চাচা কে আমিই পাঠিিয়েছি
পুকুরে জাল ফেলে মাছ তুলতে লোক আনার জন্য।
আগামী কাল তোমার বড় মেয়ে আসবে ওর বাচ্চাদের নিয়ে,
বাচ্চাদের স্কুল ছুটি তাই হয়ত ক’দিন থাকবে।আমাকে জানিয়েছে গত পরশু,আমি তোমাকে বলিনি কারণ তুমি তো ওদের ফোন দিয়ে দিয়ে পাগল করে তুলবে!
আকমল সাহেব চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পাথরের মূর্তির মত চোখ করে তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে।তাঁর মনে পড়ছে মধুমিতার কথা! মধুমিতা আকমল সাহেবের স্ত্রী, যার মৃত্যুতে তাঁর কোন আক্ষেপ নেই! নেই কোন অনুশোচনা!

( চলবে…)

কবি আঞ্জুমান আরা খান

কবি, ছড়াকার ও কথাসাহিত্যিক সম্পাদক, জলছবি বাতায়ন সাহিত্য সম্পাদক, আজ আগামী ২৪ ডটকম প্রকাশিতব্য গ্রন্থ : শ্রেষ্ঠ অনুবাদ গল্প ফেসবুক আইডি : facebook.com/anjumanara.khan.587
সকল পোস্ট : আঞ্জুমান আরা খান

১১ thoughts on “

  1. আধ‌পোড়া একটি সিগারেটের জন্য পরপর তিনবার হাত বাড়িয়ে কিছুটা নিরাশ হয়ে নিচের দিকে নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে আছে ফজর আলী। আকমল সাহেব সিগারেটের শেষাবদি আনমনা ভঙ্গিতে টেনে যাচ্ছেন, উচ্ছিষ্ট অংশ মাটিতে ফেলে পায়ে দলে নিভিয়ে নিলেন…

    রাজ‌সিক সূচনা!
    অ‌পেক্ষায় থাক‌তে হ‌বে এটাই যস্ত্রণা। উপায় কি ধারাবা‌হিক যে! তথাস্তু জলছ‌বি বাতায়ন। আঞ্জুমান আরা খান আ‌ষ্টেপৃ‌ষ্টে বঁে‌‌ধে ফে‌লে‌ছেন।

    এই উপন‌্যা‌সের সর্বনাম `তার` এ চন্দ্র দরকার নেই। রাষ্প্রপ‌তি বা প্রধানমন্ত্রী হ‌লে চন্দ্র চাই; এমন কি মন্ত্রী‌দেরও না।

    এ পর্যন্ত যে কজন চ‌রিত্র পেলাম তার ম‌ধ্যে আকমল সা‌হেব ছাড়া আপ‌নি নন।

    নি‌র্বিষ্ট ম‌নে নি‌চের তা‌কি তা‌কি‌য়ে লিখা যৌ‌ক্তিক।

    বানান ভুল নেই বল‌লেই চ‌লে। সাবলীল গদ‌্য পাঠক‌কে সহ‌জেই আকৃষ্ট কর‌তে সক্ষম হ‌বে ম‌নে হ‌চ্ছে।

    আমার ব‌্যক্তিগত অ‌ভিমত।

    1. এমন মন্তব্য কলম আটকে যাবার ভয় দূর করে দেয়। গঠনমূলক এই মন্তব্যতে শিখে নিলাম অনেক অনেককিছু! স্মরণ রাখতে চেষ্টা করব। আশীর্বাদটুকু একান্ত কামনা আমার।

মন্তব্য করুন