প্রায়শ্চিত্ত

পর্ব/৪

বেলা দু’টোয় আকমল সাহেব খাবার টেবিলে থাকেন এতে তার কোন ব্যাতিক্রম হয় না। আজ নবনীতা খেতে এসে বাবাকে না পেয়ে তার শোবার ঘরের দিকে গেল। বাবা নাক ডাকছেন বেশ জোরেসোরেই! কেনো ঘুমিয়ে গেলেন বাবা না খেয়ে! চশমাটাও খোলেননি! জানালা দিয়ে আসা বাইরের ঠান্ডা হাওয়ায় কিছুটা
জড়োসড়ো হয়ে আছেন বাবা। ।বাবার প্রতি নবনীতার ভালোবাসা পারোমিতার চেয়ে কম তবে মায়াটা বেশি। পারোমিতার কাছে বাবা পৃথিবীতে সব চেয়ে ভালো মানুষ, ভালো বাবা। নবনীতার কাছে বাবা, ভালো মন্দ মিলিয়ে বাবা। নবনীতা পারোমিতার মতো আবেগপ্রবন নয়। বাস্তবধর্মী ভাব বোধে একজন চিন্তাশীল মানুষ, তবে কিছুটা পুরুষ বিদ্বেষীও বলা চলে। হয়ত ছোটোবেলা থেকে মা না থাকায় বাবার শাসনে বড় হওয়া, তার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে পড়াশোনা চালানো,নিজের মত প্রকাশে নানা রকম বাধা এসব কারণ গুলোই দায়ী । তবে আকমল সাহেব দুই মেয়েকেই পাগলের মত ভালোবাসেন।নবনীতাও বাবার ভালোবাসার অবমূল্যায়ন করেনি কখনো কেবল পড়াশোনার বিষয়টি ছাড়া, এই জায়গাটাতে বাবার আপত্তিকে উপেক্ষা করেছে নবনীতা! কলেজ পাস করার পর সে যখন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে ভর্তির জন্য তৎপর বাবা তখন তার বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লাগেন। নবনীতা পারোমিতার মতো আপোষ করেনি।মন খারাপ করে বাড়ি ফেরেনি অনেকদিন! আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিল এক মেসবাড়িতে। তখন তার খুব একা একা লাগত! মেসের মেয়েদের সাথেই কোনরকম দিন কেটে যেত। ছেলে বন্ধু ছিল না তার ছোটোবেলা থেকেই কিন্তু ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষার সময় পরিচয় হয় আদিত্যের সাথে তারপর পরীক্ষা দেওয়া,টিকে যাওয়া এবং দুজনের একই সাবজেক্ট পাওয়া, ভর্তি হওয়া কাকতালীয় ভাবে একই সাথে ঘটেছিল। আদিত্য ছোটোবেলায় বাবা মাকে হারিয়ে মামা মামীর কাছেই বড় হয়েছে। আদিত্যের সাথে মেলামশা করতে গিয়ে কারণে অকারণে মায়া প্রকাশে সখ্যতা গড়ে উঠে তারপর বেশ মজবুত প্রণয় কিন্তু সে প্রেম বা ভালোবাসা সীমা ছাড়ায়নি কখনো কারণ নবনীতার মাঝে উতুপুতু ভাব নেই! এই বিষয়টি আদিত্যকে মাঝে মাঝেই ভাবিয়ে তুলে! অবশ্য আদিত্যও তেমনি মানুষ কিন্তু পুরুষ মানুষ বলে কথা! বেশির ভাগ পুরুষ মানুষ চায় তার সঙ্গীটির আবেগ উতলে উতলে পড়ুক! হয়ত আদিত্যও চায় কিন্তু নবনীতা সে চাওয়ায় নিজেকে বদলাতে পারে না ! এখন আদিত্যও মেনে নিয়েছে অনেকাংশে।পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর দেখা সাক্ষাৎ কম হয় তাদের তবে নিয়ম করে কথা হয় প্রতিরাতে একবার । বেশীর ভাগ সময় আদিত্যই ফোন করে। আজ কেনো যেন এই ভরদুপুরেই আদিত্যকে ফোন দিতে ইচ্ছে হচ্ছে নবনীতার, সে তার নিজের ঘরে চলে গেল।
ফোনে আদিত্যকে পাওয়া গেল না! সুইচ অফ রয়েছে।

আকমল সাহেবের ঘুম ভেঙেছে,টেবিলে খাবার দিয়েছে ফুলবানু। নবনীতাও খেতে বসেছে।
খাবারের আয়োজন বেশ ভালো, পাটশাক,চিংড়ি ভর্তা,বাইম মাছ ভূনা, মাগুর মাছের ঝোল বড় মাছের দো’পেঁয়াজা আর ডাল।
খাবার টেবিলের পাশেই ফুলবানু মোড়া পেতে বসে আছে।নবনীতা খাচ্ছে অন্যমনস্ক হয়ে, তার কেবলি মনে হচ্ছে তার পাশের চেয়ারটিতে কেউ বসে আছে এবং যে লোকটি বসে আছে টেবিলের একটি খাবারও তার পছন্দ নয়! সে মুরগীর বুকের মাংস আর ডাল ছাড়া কিছু খেতে পারে না! যে কতবার আদিত্যের সাথে বাইরে খাওয়া হয়েছে ঘুরেফিরে আদিত্য একই খাবার অর্ডার করে! আর নবনীতার খেতে হয় বাধ্য হয়ে। অথচ এই গ্রামীন খাবার গুলো নবনীতার অনেক পছন্দ।নবনীতার মনে হচ্ছে আদিত্য পাশের চেয়ারে বসে কেমন রাগি রাগি চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে ! নিজের এই ছেলেমানুষী ভাবনায় অজান্তেই ম্লান হাসল নবনীতা। আকমল সাহেবও চুপচাপ খাচ্ছিলেন কিন্তু তিনিই আগ বাড়িয়ে নিরবতা ভাঙলেন, নবনীতার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন,
-বড় বাবুরা কাল কখন আসছে?
নবনীতা চট করে উত্তর দিল,
-কাল ভোরেই রওনা দিবে ওরা, রাস্তায় জ্যাম না থাকলে আসতে যতক্ষণ লাগে।
আকমল সাহেব তার দুই মেয়েকে বড়ো বাবু ও ছোটো বাবু বলেই আজও সম্বোধন করেন। মেয়েরাও অভ্যস্ত তাই তিনিও পরিবর্তন করেন না। খাবার শেষ করে উঠে গেলেন আকমল সাহেব।

কবি আঞ্জুমান আরা খান

কবি, ছড়াকার ও কথাসাহিত্যিক সম্পাদক, জলছবি বাতায়ন সাহিত্য সম্পাদক, আজ আগামী ২৪ ডটকম প্রকাশিতব্য গ্রন্থ : শ্রেষ্ঠ অনুবাদ গল্প ফেসবুক আইডি : facebook.com/anjumanara.khan.587
সকল পোস্ট : আঞ্জুমান আরা খান

৮ thoughts on “প্রায়শ্চিত্ত

  1. বেলা দু’টোয় আকমল সাহেব খাবার টেবিলে থাকেন এতে তার কোন ব্যাতিক্রম হয় না কিন্তু আজ নবনীতা খেতে এসে বাবাকে না পেয়ে তার শোবার ঘরের দিকে গেল।———- এত বড় লাইন!

    কিছুটা কুঁচকে > শীতে কুঁচকে যাওয়া কথাটা কেমন লাগে না?

    ‘মা’ – মা শব্দটির উপর কমা দিয়ে আটকানো। কমা দিয়ে দুদিক থেকে আটকে দেয়ার মানে কি? নিশ্চয় জানতে হবে। ‘মা’ কমা দিয়ে আটকানো- তার মানে মা কি না সন্দেহ আছে। একজন সন্ত্রাসীকে যখন দেশপ্রেমিক বলি তখন ‘দেশপ্রেমিক’ কমা দিয়ে আটকাতে হয়। তার মানে সন্ত্রসী দেশপ্রেমিক নয়।

    কলেজ পাশ – এই পাশ মানে পাশে থাকা। কলেজ পাস হবে।

    কারণ গুলোই> কতবার বলব বহুবচন মূল শব্দের সঙ্গে হবে। কথাগুলো, কারণগুলো, বইসমূহ, তারকারাজি এসব।

    প্রতিটি ভুল মনে রাখা উচিত। যদি সংশোধন না হয়, তাহলে আমার কষ্টগুলো তো বিফলে যাবে।

মন্তব্য করুন