ধারাবাহিক  উপন্যাস পর্ব ২

প্রায়শ্চিত্ত

বেলা এখন প্রায় বারোটা।এই মাঝদুপুরে যেমন ঝকঝকে রোদ থাকার কথা তেমন নেই। হঠাৎ করে চারপাশ কেমন কালো মতন অন্ধকার হয়ে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা গলতে শুরু করেছে! অথচ একটু আগেও প্রচন্ড রোদে গা জ্বলে যাচ্ছিল। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে টপ্ করে একফোঁটা বৃষ্টির পানি আকমল সাহের চায়ের কাপে পড়ে গেল,তিনি চা শেষ করলেন না।কাপটা রেখে বাগানের পথ ধরে বাড়ির মূল ফটকের কাছে চলে এলেন। যত ঝুট ঝামেলা কিংবা তাড়াহুড়োই থাকুক অথবা মন খারাপের দিনেও তিনি প্রতিবার এখানে এসে থামতে ভুলেন না! ফটকের গায়ে শ্বেত পাথরে খোদাই করে লেখা রয়েছে’ স্বর্ণলতা আবাসন’ স্বর্ণলতা আকমল সাহেবের মায়ের নাম,তিনি স্বর্ণের মতই ঝলমলে রূপের অধিকারী ছিলেন। তার নাম স্বর্ণলতা কে রেখেছিলেন আকমল সাহেব জানেন না। তিনি তার নানাজানকে সইন্যলতা বলে ডাকতে শুনেছেন কারণ তার নানাজান তেমন লেখাপড়া জানা মানুষ ছিলেননা। স্বর্ণকে বোধকরি তাই তিনি সইন্য বলতেন অনেকটা আঞ্চলিকতায়।মায়ের নামেই বাড়িটির নামকরণ করা হয়েছে ‘স্বর্ণলতা’। মায়ের মৃত্যুর পর থেকে আকমল সাহেব বাড়িতে ঢোকার আগে বাচ্চাদের মত মনে মনে বানান করে লেখাটুকু পড়ে নেন! এতে তার মনে হয় তিনি মাকে স্পর্শ করছেন অথবা মা তাকে।মানুষ বড়ই আজব জীব!
বাড়িটির শুধু মূল ফটকে নয় পুরো বাড়িতেই বেশ আভিজাত্য আর আধুনিকতার ছাপ রয়েছে। ময়মনসিংহ সদর থেকে কয়েক কিলোমিটার ভেতরে পল্লী এলাকায় এই বাড়িতে আকমল সাহেবদের চৌদ্দ পুরুষের বসবাস। কিছুদিন আগেও এটি অজপাড়া গাঁ বলেই লোকে জানত, এখন অবশ্য বেশ উন্নত হয়েছে।আকমল সাহেব বাবা মার একমাত্র সন্তান, মা মারা গিয়েছেন আকমল সাহেবের বিয়ের এক বছর পর আর বাবাকে হারিয়েছেন তিনি যখন কলেজে পড়েন তখন। বাপ দাদার আমল থেকেই বাড়িটি বেশ আধুনিক তবে আকমল সাহেব মধুমিতাকে বিয়ে করার সময় বাড়িটি পূর্ণ আধুনিকতার রূপ দিয়েছেন।সান বাঁধানো পুকুর ঘাট ,বাগান তাছাড়া বাড়ির ভেতর আধুনিক সকল সুযোগ সুবিধা সহ বেশ ছিমছাম এবং গোছানো।
আকমল সাহেব বাড়িতে প্রবেশ করেই ফুলবানুকে চায়ের কথা বলে গোসল করতে ওয়াশরুমে ঢুকলেন।পানি গরম করাই ছিল, তিনি বেশ আয়েশ করেই গোসল সেরে বের হলেন। ফুলবানু চা নিয়ে হাজির,চায়ের সাথে চার পাঁচটা গ্লুকোজ বিস্কুট, আকমল সাহেবের এটি পছন্দের বিস্কুট।
যদিও সকালবেলা ছাড়া তিনি কখনোই চায়ের সাথে বিস্কুট খান না কিন্তু ফুলবানুকে বলে কোন লাভ নেই! তার নাকি কাউকে খালি চা দিতে ভালো লাগেনা! অথচ ফিরে যাওয়া এই নেতানো বিস্কুট সে নিজেই খায় । চায়ের ট্রে নামিয়ে রাখতে রাখতে ফুলবানু বলে উঠল,
-জোহুরের আযান হইতেছে ভাত খাইবেন কহন চাচাজি?
এই অসময়ে চা খাইলে তো খিদা নষ্ট!
আকমল সাহেব তার কথার জবাব দিলেন না। বললেন,
-পান দিয়ে যাস নামাজ পড়ে পান খাবো।
ফুলবানু এ বাড়ির বাঁধা কাজের লোক, মা বাবা নেই, গ্যাতি গোষ্টির খবরও কেউ জানেনা! তার বয়স আনুমানিক তিরিশের কাছাকাছি,চার পাঁচ বছর বয়স থেকে এই বাড়িতে আছে।জন্মের সময় মা মারা গিয়েছে বাবা তারও আগে। শিশু বয়সটা কেটেছে ফজর আলীর নানীর কাছে,ফজর আলীর নানী তার দুঃসম্পর্কের নানী।ফজর আলীর হাত ধরেই তার এ বাড়িতে আসা, ফজর আলীকে সে মামুজি বলে ডাকে, অবশ্য এই ডাক ফজর আলীর পছন্দ না। এই বাড়িকে ফুলবানু তার নিজের বাড়ি মনে করে।
বাড়ির লোক জনও তাকে বেশ আপন করে নিয়েছে ।সবার প্রতি যেমন বাড়তি যত্ন আত্তি করে সে তেমনি অধিকার নিয়ে শাসনের সুরে কথাও বলে। বিয়ের কথা উঠলে বলে,
– এই বাড়ি ছাইড়া কই যামু!
চাচাজিরে দেখব কেডা!
তবে নবনীতা বাড়ি আসলে ফুলবানু একটু ভয়ে ভয়ে থাকে কারণ নবনীতা তাকে একদমই পছন্দ করে না।

কবি আঞ্জুমান আরা খান

কবি, ছড়াকার ও কথাসাহিত্যিক সম্পাদক, জলছবি বাতায়ন সাহিত্য সম্পাদক, আজ আগামী ২৪ ডটকম প্রকাশিতব্য গ্রন্থ : শ্রেষ্ঠ অনুবাদ গল্প ফেসবুক আইডি : facebook.com/anjumanara.khan.587
সকল পোস্ট : আঞ্জুমান আরা খান

১০ thoughts on “

  1. নবনীতা বাড়ি আসলে ফুলবানু একটু ভয়ে ভয়ে থাকে কারণ নবনীতা তাকে একদমই পছন্দ করে না।

    একবাক্যে অনেক কথা। খুব সুন্দর আপু।

  2. অন্ধার তো কা‌লো। কা‌লোর ম‌তো অন্ধকার লিখ‌বে না।
    ট বর্গীয় অর্থাৎ ট ঠ ড ঢ এর সা‌থে সব সময় ণ যুক্ত হ‌বে। ন ভুল।
    প্রচন্ড হ‌বে না, হ‌বে প্রচণ্ড
    কণ্টক
    লণ্ঠন
    ভণ্ড
    মূল ফট‌কের কা‌ছে চ‌লে এ‌লেন? তু‌মি কি ছি‌লে সেথায়? ছি‌লে না তো। লিখ‌বে গে‌লেন।
    জ্ঞা‌তি‌গোষ্ঠী এক শব্দ।

    সহ সবসময়ই মূল শ‌ব্দের কো‌লে চ‌ড়ে বস‌বে। গাছসহ, পাতাসহ।

    না শব্দ‌টি সব সময় আলাদা। ক‌য়েক জায়গায় এক হ‌য়ে‌ছে।

    ভুলগু‌লো ম‌নে রে‌খো।

মন্তব্য করুন