জলছবি প্রকাশন

সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান

Home »

ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব- ২

তৃতীয়জন

সকাল থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। গতকালের ভীষণ গরমের পর স্বস্তির আবেশ ছড়িয়ে পড়েছে ক্যাম্পাস জুড়ে। এ যেন সুখের আমন্ত্রণ! ছাতা না থাকায় সাব্বির আর অংশু প্রথম ক্লাসে ভিজতে ভিজতে হাজির হলো। স্বভাবতই মাঝের সারিতে বসার অভ্যাস অংশুর। কিন্তু সেগুলো আগেই দখল করে নিয়েছে বুদ্ধিমান ছেলারা। বাধ্য হয়েই সামনের সারিতে বসতে হলো অংশুদের। হাই-হ্যালো করে অনেকের সাথেই পরিচিত হলো ওরা। এমন উৎসবের আমেজে আজ যেনো আবার নতুন করে পুরাতন নিজেকে খুঁজে পেতে শুরু করল অংশু। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিক্ষক চলে আসবেন, তাই সময় নষ্ট না করেই বাকি সকলের সাথে পরিচিত হয়ে নিলো সে। এখনো অনেকেই পৌঁছাতে বাকি আছে। দুষ্টু-মিষ্টি ছেলেমেয়েরা মেতে আছে আনন্দে। গুরুগম্ভীর কিংবা সিরিয়াস টাইপের ছেলেমেয়েও আছে বেশ কয়েকজন। নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগবে তাদের।

সকলের সাথে কুশল বিনিময় সেরে নিজের আসনে এসে বসল। বেশ খানিকটা সময় কেটে গেলো। সাব্বির খোঁচাতে শুরু করল অংশুকে। ‘ওই দেখ আসছে!’ আঙুল দিয়ে ইশারায় দরজার দিকে নির্দেশ করল। অংশুর চোখ আটকে গেল দরজার ওপাশ থেকে হেঁটে আসা একটি মেয়ের দিকে। সেই মেয়েটি! প্রথমদিন যার সাথে ক্যাম্পাসের গেটে ভুলবোঝাবুঝি হয়েছিলো। শুভ্রবসনা! খোলা চুল বাতাসে দুলছিল। বৃষ্টির কণাগুলো ঝরে পড়ছিল মুক্তো হয়ে। স্মিত হাসি হৃদয় জুড়িয়ে দেয়। একচিলতে মেঘ সরে যেনো আলোর ঝর্ণাধারা বইল। অংশুর চোখ আটকে গেল, বাতাস যেনো কানে কানে আওড়ে গেল-

‘বাহুখানি নাড়ি মৃদু ঝিনিঝিনি
বাজাইয়া দিল করকিঙ্কিণী,
হাসিজালখানি অতুলহাসিনী
ফেলিলা কবিরে ঘেরি।’

মোহের ঘোর কাটতেই নিজেকে সামলে নিলো অংশু। যাচ্ছেতাই ভাবছে সে। নিজেকে প্রবোধ জানাল। চোখ সরিয়ে নিলো মুহূর্তেই।

ক্লাসে প্রবেশ করে পরিচিত কয়েকজনের সাথে বসে পড়ল মেয়েটি। ‘ওভারস্মার্ট’ সাব্বির টিপ্পনী কেটে ফিসফিস করে বলল। অংশু হেসে বলে ফেললো, ‘এজন্যই বুঝি তোর এতো আগ্রহ!’ সাব্বির হেসে বললো, ‘আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবো! আমি সেলাম জানাই গুরু!’

ব্যাচ কো-অর্ডিনেটর স্যার চলে এসেছেন। সকলকে আজকে আবারও স্বাগত জানিয়ে নিজের পরিচয় দিলেন। এরপর একে একে সকলেই নিজের পরিচয় দিতে লাগল। ভিকারুননিসা নূন কলেজের ছাত্রী ঐশী! হ্যাঁ, এই প্রথম নামটি জানা হলো। জান্নাতুল ঐশী, ভাইস-চ্যান্সেলর স্যারের একমাত্র কন্যা। রূপবতী, মেধাবী এবং গুণবতী। স্কুল এবং কলেজ পর্যায়ে পার্লামেন্টারি ডিবেট চ্যাম্পিয়ন! ক্লাসের সকলের আগ্রহ এখন সেদিকেই। মৃদু হেসে নিজের পরিচয় দিলো ঐশী।

ক্লাসের সকলেই নিজনিজ গুণে গুণান্বিত। এই যেমন, সাদমান ভালো গীটার বাজাতে জানে, বন্যা নামের অতি স্লিম মেয়েটি নাচে নতুন কুঁড়ি চ্যাম্পিয়ন, কামাল ছেলেটি সেকেন্ড ডিভিশন ক্রিকেট খেলে, মামুন ভালো গাইতে জানে, আরিফ ভালো ফুটবল খেলে, তনু নামের মেয়েটি আবৃত্তি করতে জানে…আরও অনেকেই অনেক কিছুতে পারদর্শী। এমন সব মেধাবী শিক্ষার্থী পেয়ে ডিপার্টমেন্ট নিশ্চয় ধন্য হলো।

অংশু নিজের সম্পর্কে কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। অতি ভালো রেজাল্টও নয় তার। মফস্বলের দুরন্ত বালক। যদিও মহল্লার সকলেই তাকে মেধাবীদের কাতারে ফেলে। অংশু আপন মনে ভাবছিল…এরমধ্যে সাব্বির খোঁচাতে শুরু করল আবার! ‘ওঠ, এবার তোর পালা!’

অংশু নিজেকে নিতান্তই সাধারণভাবে উপস্থাপন করল, ‘আমি অংশুমান, অংশুমান সাহা। বাবা-মায়ের প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা অতিসাধারণ একজন বালক। বলার মতো কোনো গুণ নেই আমার। মফস্বলে বেড়ে ওঠা, মফস্বলেই পড়াশুনা। স্বপ্ন দেখি কণ্টকাকীর্ণ সমাজের কাঁটাতারগুলো একদিন দূর হয়ে সুন্দর একটি অহিংস পরিবেশে বেড়ে উঠবে আমাদের উত্তর প্রজন্ম। উজ্জ্বল এক আলোক উৎসবের মাঝে ধরিত্রির সকল সন্তান এক হয়ে ভালোবাসা বিলিয়ে যাবে। ভালোবাসা পেতে যেমন ভালোবাসি, ভালোবাসা দিতেও ভালোবাসি। সকলকে আমার প্রাণের শুভেচ্ছা এবং অফুরান  ভালোবাসা। ধন্যবাদ।’

অংশুর অতি সাধারণ কথাগুলো সকলকে মুগ্ধ করল। কো-অর্ডিনেটর স্যার জানালেন, এমন সুন্দর করে যে ভাবতে পারে, তার আলাদা গুণের কী দরকার! সে তো বিশেষ গুণের অধিকারী, সেই গুণ আর কিছু নয়, মানবিক গুণ। অভিনন্দন অংশু তোমাকে।

প্রথম দিন এই একটি সৌজন্যমূলক ক্লাস দিয়েই শেষ হলো। কিছু বই কেনার পরামর্শ দিয়ে কো-অর্ডিনেটর স্যার বেরিয়ে পড়লেন।  সবার মতো সাব্বির আর অংশু বের হলো ক্লাস থেকে। পরিকল্পনা মতো বটতলায় সময় কাটাবে কিছুক্ষণ। কিছু বই কিনতে লাইব্রেরিতে যেতে হবে আজ।

সাব্বির, কামাল, সাদমান, অংশুসহ ক্লাসের কয়েকজন চা খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিল ক্যাম্পাসের দক্ষিণের বটতলায়। এই যায়গাটা বেশ পছন্দ হয়েছে অংশুর। ঠিক তার নিজের মনের মতো একটি স্থান। কোলাহল নেই, কিন্তু প্রাণোচ্ছল। লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেটটা সবে ধরিয়েছে, এমন সময় বেশ উপহাসের সঙ্গে একটি কণ্ঠ বলে উঠল, ‘খুব অসভ্য অভ্যাস!’

অংশু পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল ভিসি স্যারের মেয়ে! তার হঠাৎ আগমনে সবাই একটু ভড়কে গেল! যার যার হাতে সিগারেট ছিলো, চটজলদি মাটিতে ফেলে পা দিয়ে নিভিয়ে দিল। অংশুর সিগারেট তখনো হাতে। সকলের ফেলে দেওয়া দেখে সেও ফেলে দিলো জলদি করে। সবার মুখের অবস্থা দেখে হেসে উঠল ঐশী!

-‘ভিসি স্যারের মেয়ে বলেই কি এতোখানি সমীহ করা? বিষয়টি আমার জন্য বিব্রতকর। আমরা একইসাথে ভর্তি হয়েছি, এই ব্যবধানটুকু না রেখে আমরা বন্ধু হতে পারি না?’ কথাগুলো বলে ঐশী হাত বাড়িয়ে দিলো। সবাই মুচকি হেসে সম্মতি জানালেও হাত মেলানোর দুঃসাহস দেখালো না কেউ! ঐশী বুঝতে পেরে হাত নামিয়ে নিলেও মনে মনে খানিকটা ক্ষুব্ধ হলো। সেসব নিজের ভেতর রেখে আবার হেসে বলল, ‘আমি এখানে আগে কখনোই আসিনি। এই ক্যাম্পাসেও আসা হয়নি কখনো। গতরাতে প্রথমবার এখানে এসেছিলাম আমার খালাতো ভাইয়ের সাথে। উনি এমবিএ করছেন এখানে। একটি কথা না বললেই নয়, আমি কিন্তু বাবার পরিচয়ে ভর্তি হইনি, আমি জান্নাতুল ঐশী-এটিই আমার আইডেন্টিটি। অনুরোধ থাকবে, তোমরা আমাকে স্রেফ বন্ধু হিসেবেই দেখবে।’ একটু থেমে সবার দিকে একবার তাকিয়ে আবার শুরু করল, ‘ও হ্যাঁ, তোমাদের ডিস্টার্ব করার জন্য সরি!’ কথাগুলো গড়গড় করে বলে হাটতে শুরু করল। যেনো কিছু একটা লুকিয়ে ফেলতে চাইল সকলের কাছ থেকে।

ঘটনাটি দ্রুততম সময়ে ঘটে গেল বলে সবাই অবাক হয়ে চেয়ে রইল ঐশীর চলে যাওয়া পথের দিকে। ‘মেয়েটি খুব অদ্ভুত তাই না?’ অজান্তেই বলে উঠল অংশু৷ হতভম্ব বাকিরা শুধু মাথা নাড়ল। বিষয়টি গুরুত্বহীন হতে পারত, কিন্তু একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি অংশুকে ভাবিয়ে তুলল৷ এমন অদ্ভুত আচরণ তার কাছে স্বভাবতই নতুন। মফস্বলের মেয়েরা খুব বেশি লাজুক হয়, নয়ত বড্ড বেশি অভিমানী। কিন্তু এই মেয়েটি লাজুকও নয়, অভিমানীও নয়; তবে কি দাম্ভিক? অনেকের চোখে তেমন হতেও পারে, কিন্তু অংশুর বারবার মতে হতে লাগল মেয়েটি বড্ড বেশি নিঃসঙ্গ। নিজের অনেক না বলা কথা বলতে চাওয়ার আকুতি খুব বেশি ধরা পড়ছে ওর চোখেমুখে। কী জানি! এতোসব ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে না ওর। হয়তো শহুরে মেয়েদের চিনতে অনেক সময় লাগবে ওর।

লাইব্রেরি থেকে প্রয়োজনীয় কিছু বই কিনে সাব্বিরকে বিদায় দিয়ে এলাকার এক বড় ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেল অংশু। ফিরতে বেশ রাত হলো। রিকশায় করে যখন মহিলা হোস্টেলের পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল, তখন হঠাৎ চোখ পড়ল রাস্তার ঠিক ডানপাশে একটি অচেতন দেহ পড়ে আছে। দ্রুত রিকশা থামিয়ে নেমে পড়ল। রিকশাওয়ালা বারবার নিষেধ করলো, ‘মামা, যাইয়েন না।’

‘আরে, এ তো আমাদের ক্লাসের তনু!’ আবছা আলোয় ঠিকই চিনতে পেরেছে। কপালে আঘাতের চিহ্ন, মুখ বেয়ে নেমে আসা রক্ত জমাট বেঁধে আছে। এমন অবস্থা কী করে হলো! অংশু নাকের কাছে হাত রাখল; নিশ্বাসের সাথে গরম বাতাস বের হচ্ছে, এখনো জ্ঞান আছে। দৌড়ে মহিলা হোস্টেলের গেটের কাছে ছুটে গেল। গেট ধাক্কাতে লাগল, ‘কেউ আছেন?’ ‘শুনছেন, কেউ আছেন?’ ভেতর থেকে কোনো সাড়া পেলো না। ‘শুনছেন, কেউ আছেন?’

হতবিহ্বল হয়ে এদিক ওদিক ছুটতে লাগল অংশু, কাউকেই পেলো না। রিকশাওয়ালাও নেই, কেটে পড়েছে। ক্যাম্পাসের কিছুই ঠিকমতো চিনে ওঠা হয়নি এখনো। মেডিকেল কোনদিকে জানা নেই। একটুখানি জল পেলে নিশ্চয় জ্ঞান ফেরাতে পারতো মেয়েটির। কী করবে, কিছুই ভাবতে পারছে না। মোবাইলটা বের করে সাব্বিরকে ফোন দিলো। কিন্তু বিধি বাম! নেটওয়ার্ক নেই!

সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, আর দেরি করা চলে না। তনুকে বাঁচাতেই হবে। নিজের কোলে তুলে নিয়ে যথাসম্ভব দ্রুত মেইন গেটের দিকে ছুটতে শুরু করল অংশু। সমস্তদিনের ক্লান্তি ভুলে অংশু মফস্বলের সেই দুরন্ত বালক হয়ে উঠল। আপদে বিপদে ক্লান্তিহীন ছুটে চলাই ছিলো যার স্বভাবসুলভ চরিত্র।

মেইনগেটের কাছে পোঁছাতেই একটি রিকশা পেয়ে গেল। কিন্তু ক্যাম্পাস পুলিশের জেরার মুখে পড়ল। অসঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্য মনে হওয়ায় পুলিশ অংশুকে ছাড়তে রাজি হলো না। নিরুপায় হয়ে অংশু মিনতি করে অনুরোধ করলো আগে মেয়েটিকে ভর্তি করার ব্যবস্থা করুন। পুলিশের একটি গাড়ি এসে তনুকে মেডিকেলের দিকে নিয়ে চলে গেল। ভাইস চ্যান্সেলর স্যারকে ফোনে সবকিছু জানিয়ে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে থানার দিকে রওনা হলো পুলিশের আরেকটি গাড়ি।

একটি সুন্দর দিনের শুরু এভাবে শেষ হবে, স্বপ্নেও ভাবে না কেউ। অংশু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লাল-নীল বাতি জ্বলা মায়ার শহরের রাস্তায় চোখ রেখে ছুটে চললো থানার দিকে।

‘কেউ জানে না একেকটি মানুষ বুকের মধ্যে কী গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বেড়ায়-

কোনো বিষণ্ন ক্যাসেটেও এতো বেদনার সংগ্রহ নেই আর

এই বুকের মধ্যে দীর্ঘশ্বাসের পর দীর্ঘশ্বাস যেন একখানি অন্তহীন প্রগাঢ় এপিক!’

(চলবে)
প্রথম পর্বের লিংক  তৃতীয় জন (পর্ব-১)

Name of author

Name: নীলকণ্ঠ জয়

Short Bio: একজন সাধারণ মানুষ। সম্পাদনাঃ অবসরে কিছুক্ষণ, কালের লণ্ঠন। সহ-সম্পাদনাঃ জলছবি বাতায়ন। নির্বাহী সম্পাদক এবং প্রশাসক(মডারেটর): জলছবি বাতায়ন। কাব্যগ্রন্থঃ দহনকালের কাব্য (২০২১), জলছবি প্রকাশন। সায়েন্স ফিকশনঃ ক্রেপাসকুলার (২০২০), জলছবি প্রকাশন। কিশোর অ্যাডভেঞ্চারঃ নাথু দ্য গ্রেট (২০১৯), জলছবি প্রকাশন।

১৪ Replies to “”

মন্তব্য করুন