জলছবি প্রকাশন

সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান

Home » তৃতীয়জন (পর্ব ৪)

তৃতীয়জন (পর্ব ৪)

হলে ফিরে দরজায় অনেকক্ষণ ধরে নক করল অংশু। সারারাতের ক্লান্ত অবসন্ন শরীর একটুখানি বিশ্রাম চাইছে। ক্লাসে যাওয়ার আগে ঘন্টা দুই সময় হাতে পাওয়া যাবে। রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভুলে যেতে ইচ্ছে করছে। দুঃস্বপ্ন ভুলে যেতেই ভালোবাসে মানুষ, সহজে কি পারে? অংশু জানে দুঃসময়ের শুরু হয়েছে কেবলমাত্র, এর শেষ কোথায় একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। তিনিই প্রতিটি জীবনের প্রতিটি ঘটনার স্ক্রিপ্ট লিখে চলেছেন। পৃথিবীর ভারসাম্যের জন্য, দুঃখ সুখের সমানুপাতিক বন্টনের জন্য ইতিহাস কিছু মানুষকে বেছে নেয়! অংশু হয়তো সেইসব চরিত্রের একজন অভিনেতা হতে চলেছে।

অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করার পর সাব্বির দরজা খুলল। চোখেমুখে ফুটে ওঠা বিস্ময় লুকিয়ে রেখে গম্ভীরমুখে নিজের বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ল। দরজায় নক পড়লে এখন বুকটা কেঁপে ওঠে। অংশু খেয়াল করল সাব্বির কিছু একটা লুকাতে চাইছে।  শার্ট-প্যান্ট খুলে চেয়ারের উপর রেখে সাব্বিরকে বলল, ‘বড় ভাই ছাড়তে চায়নি, তাই রাতে ফেরা হয়নি। তোকে ফোনে ট্রাই করেও পাইনি। ‘

সাজানো গোছানো কথাগুলো সাব্বিরের পছন্দ হল না মনে হলো। গতরাতের ঘটনার পর থেকে এই পর্যন্ত দুশ্চিন্তায় কিছুতেই নিজেকে হালকা করতে পারছে না। অংশু মিথ্যা বলছে এই বিষয়ে নূন্যতম সন্দেহ নেই ওর। বরং অবাক হচ্ছে এই ভেবে যে, যার জন্য জীবনের উপর দিয়ে এই ঝড় বয়ে যাচ্ছে, সে কী না মিথ্যা বলছে! একদিনেই অংশুকে অনেক বেশি আপন করে নিয়েছিল সাব্বির। মন থেকে বিশ্বাস শব্দটিকে বিসর্জন দিতে ইচ্ছে করছে না কিছুতেই। মানুষ চিনতে বরাবরই ভুল করে সে। চিত্রা পাড়ের দুষ্টু ছেলেটি অনেক বেশি সহজ সরল। জীবনে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কতোরকমের পাগলামি করেছে, একমাত্র সে জানে। কিন্তু বন্ধুরা কখনোই বিপদে ফেলে যায়নি। ছাত্রনেতা কাদিরের চেহারা মনে পড়লেই শিউরে উঠছে মনটা, হৃত কম্পন বেড়ে যাচ্ছে ভয়ঙ্করভাবে। যে অংশুকে এতোখানি আপন মনে করেছে, সেই অংশুই তাকে বিপদে ঠেলে দিল? মানুষ এমন কেনো হয়, সাব্বির আর কিছু ভাবতে পারছে না। অংশুর মুখ দেখলে মনটা বিষিয়ে উঠছে। হঠাৎ চোখ পড়লো চেয়ারে রাখা অংশুর সাদা শার্টের উপর। লাল রক্তের দাগ সাদা শার্টের উপর উজ্জ্বল হয়ে আছে! বুকটা কেঁপে উঠল। রাগে গজগজ করতে শুরু করল, ‘ছিঃ তুই মারামারি কাটাকাটি করে এসেছিস? তোর মতো বন্ধু…ছিঃ আমি ভাবতেও পারছি না। ফ্রড…মিথ্যাবাদী…’ ঘৃণায় মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না সাব্বিরের। অংশু কিছুটা অবাক হল! কিন্তু সাব্বিরের দৃষ্টি শার্টের উপর দেখে নিজেও চোখ ফেরাল সেদিকে! বুঝল, আর কিছুই লুকানো ঠিক হবে না। একটি মিথ্যা ঢাকতে হাজারো মিথ্যা বলে একসাথে চলা যায় না। তাছাড়া কাউকে না কাউকে সবকিছু খুলে বলতেই হয়। এতে নিজের ভেতরের কষ্ট কিছুটা হালকা হয়। যদিও পুলিশ অফিসার আরমান বিষয়টি চেপে যেতে বলেছিলেন, তবুও সাব্বিরকে খুলে বলাটাই উচিৎ বলে মনে করল। নিজের রুমমেট সাব্বিরকে খুব বিশ্বাস করে অংশু।

সাব্বিরের পাশে বসে গতরাতে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা খুলে বললো অংশু। সাব্বিরের চোখ বেয়ে জল নেমে এলো। অংশুর জন্য ভীষণ মায়া হল, দুশ্চিন্তা ভর করল তনুর জন্য। এই মানুষটিকেই সে অবিশ্বাস করেছে…! নিজেকে প্রবোধ জানাল সে। সাব্বির অংশুর হাত ধরে বলল, ‘আজ থেকে এই যুদ্ধে আমি তোর সঙ্গে আছি। আমাকে ক্ষমা করে দে, আমি অযথাই তোকে ভুল বুঝেছি।’ বন্ধুকে বুকে টেনে নিল অংশু। বন্ধুত্ব এমনই মধুর এক সম্পর্ক, যেখানে অভিমান শব্দকে প্রশ্রয় দিতে নেই। বন্ধুত্ব এমনই মধুর এক সম্পর্ক, যেখানে দূরত্ব রাখতে নেই। সাব্বিরের মনে একটাই ভয়, ছাত্রনেতা কাদির যেকোনো সময় অংশুর খোঁজ পেয়ে যাবে। ওর ছেলেরা চারিদিকে নজর রেখেছে। অংশুকে তুলে নিতে লোক চলে আসবে ঠিকই। স্পষ্টই বুঝতে পারছে তনুর ঘটনার সাথে কাদিরের হাত আছে। এইসব অংশুর জানা দরকার। আর তাই দ্বিতীয়বার চিন্তা না করেই অংশুকে গতরাতের ঘটনা হুবহু খুলে বলল সাব্বির। অনুরোধ জানাল আজ বাইরে বের না হতে। সাব্বিরের ঘটনা শুনে অংশুর বুঝতে বাকি রইল না পুলিশ অফিসার বারবার কোন জঞ্জাল সাফ করার কথা বলছিলেন। সাব্বিরের আতঙ্কগ্রস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে উঠল, ‘তুই নিজেই তো বললি এই যুদ্ধ আজ থেকে দুইজনার! তাহলে বাইরে যাব না কেনো? এভাবে ঘরে থেকে সমাধান সম্ভব নয় বন্ধু। ক্যাম্পাসের কেউ না জানুক, একটি অদৃশ্য যুদ্ধের জালে আটকে পড়েছি আমরা। জানি না এর শেষ কোথায়, তবে শেষটা আমি দেখতে চাই…!’ অংশুর চোয়াল দৃঢ় সংকল্প দেখে সাব্বির আরও বেশি শংকিত হল। দুষ্টুমির রাজা হলেও বরাবরই ভীতু প্রকৃতির ছেলে সাব্বির নিজের ভিতরকার আমিকে খুঁজে পেতে শুরু করেছে অংশুকে দেখে। এমন দৃঢ়চেতা মানুষ খুব কম দেখেছে সে। ‘ফুলদানি কখনো ফাঁকা রাখতে হয় না বন্ধু, ফুলদানিতে সর্বদাই ফুল সাজিয়ে রাখতে হয়। এই ক্যাম্পাসের জঞ্জাল সরিয়ে আমরা ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেব।’ সাব্বিরের হাত ধরে ক্যান্টিনের দিকে হাটতে শুরু করল অংশু। ‘নাস্তা সেরে ক্লাসে চল…!’

দিন যত বাড়ে ক্যাম্পাসের কোলাহলও তত বেড়ে যায়। এমন কোলাহলে মানুষ আনন্দ খুঁজে পায়, খুঁজে পায় জীবনের আলোড়ন। অথচ মাঝেমধ্যে এই ক্যাম্পাস ধারণ করে ভয়ঙ্কর রূপ! অংশু ভাবতেই পারছে না এখানে একরাতে কতো কী ঘটে যায় নীরবে! কেউ বুঝতে পারে না, কেউ জানতেও পারে না! জানলেও মুখ খোলার দুঃসাহস দেখায় না! কংক্রিটের এই সীমানা প্রাচীর অনেক ঘটনা নীরবে দেখে যায়। পিচঢালা এই নিরিহ পথগুলো অনেক ঘটনা বুকে পেতে নেয় নিঃশব্দে! গাছগুলোর বোবাকান্না কেউ শোনে না।

‘অংশু, শুনছো?’ ডাক শুনে পিছন ফিরে তাকাল অংশু আর সাব্বির। রিকশা থেকে নেমে এলো ওড়না টেনে অর্ধেক মুখ ঢাকা একটি মেয়ে। টানাটানা চোখ দেখে চিনতে কষ্ট হলো না তনুকে।

‘থ্যাংকস আ লট অংশু। আই এ্যাম রিয়েলি সরি। আমার জন্য তোমাকে…!’ অংশু তনুর কথা কেড়ে নিয়ে মুখে আঙুল দিয়ে ইশারায় থামতে বলল! ‘কিচ্ছু ঘটেনি। চলো ক্লাসে যাই।’ বিষয়টি হালকা করার সুযোগ দিতে সাব্বির হেটে এগিয়ে গেল ক্লাসের দিকে।

এতোকিছু ঘটে যাওয়ার পরও অংশুর অতি স্বাভাবিক আচরণে অবাক হলো তনু। জ্ঞান ফেরার পর অফিসার আরমান সবকিছু খুলে বলেছে তাকে। একটি ছেলে জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি নিয়ে তার জীবন বাঁচিয়েছে। শুধুমাত্র ধন্যবাদ দিয়ে এই ঋণের শোধ হয় না। অংশুর মুখের দিকে তাকালে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে। মাথা নিচু করে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো তনু! ‘আমি নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারব না। আমার জন্য তুমি নিজের বিপদ ডেকে এনেছ…আমার জন্য তোমার…’ কথাগুলো শেষ করতে পারল না তনু। ফুফিয়ে উঠল… অঝোরে ঝরছে চোখের জল। অপরাধবোধ দুমড়ে মুচড়ে ফেলছে তনুর নরম হৃদয়কে। এই সহজ সত্যটুকু বুঝতে কষ্ট হল না অংশুর। কিছু না ভেবেই তনুর হাত ধরে টেনে রিকশায় তুলে নিল। খুব বেশি সংকোচবোধ হয়নি তার।

রিকশা চলছে ক্যাম্পাসের পিচঢালা পথ ধরে। তনু আর অংশু প্রথমবারের মতো এক রিকশায়! কারো মুখে কোনো কথা নেই। হালকা বাতাসে তনুর মুখ থেকে ওড়না সরে যায়। মেয়েদের এমন নিষ্পাপ চেহারা আগে কখনো দেখেনি অংশু। নিজের ভিতরের সবটুকু আবেগ বেরিয়ে আসলে মেয়েদের চেহারা এতোখানি নিষ্পাপ হয়ে ওঠে বুঝি! আলতো করে বেঁধে রাখা চুলগুলো পাখা মেলে উড়তে চাইছে বাতাসে। ডানা মেলে উড়ে বেড়ানোর ভরসার বাতাস খুঁজছে যেনো। অংশু চোখ ফিরিয়ে নিল।

নরম তুলোর মতো ভিজে চুপসে থাকা বালিকার ব্যকুলতা শুধুই কি অপরাধ বোধ? স্পর্শে যে শিহরণ ছড়িয়েছে, সেই পঙক্তিমালার অর্থ কি কিছুই নয়? তনু অনেক কথা বলতে চায়, কিন্তু কিছুই বলতে পারে না। অংশুর দিকে তাকানোর সাহস হলো না তার। আবেগী চোখ বড্ড বেশি অভিমানী হয়ে উঠেছে। বিন্দু বিন্দু জল বেয়ে নেমে এসেছে ঠোঁট থেকে চিবুকে। তনুর ব্যকুল হৃদয় বলতে চায়,

‘ও নোনা জল, তুই আমার হয়ে বলে দিস তারে…!’

নরম মেঘগুলো উড়ে চলে বাতাসে, ডানা মেলে উড়ে যায় বক শালিকের দল। মেঘের আড়ালে একচিলতে আলো উঁকি দিয়ে যায়। ক্যাম্পাসের দেয়ালজুড়ে বেড়ে ওঠা শেওলাগুলি চেয়ে থাকে মেঘের দিকে। একপশলা বৃষ্টি আসবে কখন। যৌবনের মহাসঙ্গীতে নেচে উঠবে ধরণী। ডানা ভাঙা ইকোরাস আবার মেলবে পাখা, ছন্দহারা কবিতার পঙক্তিগুলো শব্দ খুঁজে পাবে।

ত্রিচক্রযান এগিয়ে চলেছে নীরবতা ছাপিয়ে।পিচঢালা পথ চাতকের মতো চেয়ে আছে ভেজা তুলোর মতো নরম  বালিকার মুখপানে…

তৃতীয় পর্বঃ

https://jalchhabi.org/%e0%a6%a4%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a7%80%e0%a7%9f%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac-%e0%a7%a9/

Name of author

Name: নীলকণ্ঠ জয়

Short Bio: একজন সাধারণ মানুষ। সম্পাদনাঃ অবসরে কিছুক্ষণ, কালের লণ্ঠন। সহ-সম্পাদনাঃ জলছবি বাতায়ন। নির্বাহী সম্পাদক এবং প্রশাসক(মডারেটর): জলছবি বাতায়ন। কাব্যগ্রন্থঃ দহনকালের কাব্য (২০২১), জলছবি প্রকাশন। সায়েন্স ফিকশনঃ ক্রেপাসকুলার (২০২০), জলছবি প্রকাশন। কিশোর অ্যাডভেঞ্চারঃ নাথু দ্য গ্রেট (২০১৯), জলছবি প্রকাশন।

১০ Replies to “তৃতীয়জন (পর্ব ৪)”

মন্তব্য করুন