জলছবি প্রকাশন

সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান

Home » জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা

১৮৯৯ সাল ২৪ মে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই বিখ্যাত কবি। তার পিতার ছিলেন কাজী ফকির আহমদ এবং মা ছিলেন জাহেদা খাতুন।

তার পিতা ছিলেন সেখানকার মসজিদ ইমাম এবং মা ছিলেন গৃহবধূ। তাঁর পিতার অকাল মৃত্যুর পরে, তাঁর প্রথম জীবনে তিনি যে কষ্টের মুখোমুখি হয়েছিল তার কারণে গ্রামবাসীরা তাঁকে ‘দুখু মিয়া’ ডাকনাম দিয়েছিলেন। তিনি যখন দশ বছর বয়সে ছিলেন, তখন তিনি তার পরিবারের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে স্কুলে শিক্ষকদের সহায়তা করার জন্য তাঁর বাবার জায়গায় কাজ শুরু করেছিলেন।

১৯১০ সালে তিনি রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুল এবং পরে মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে পড়াশোনা করেন। কিন্তু শীঘ্রই তিনি আর্থিক সঙ্কটের কারণে পড়াশোনা ত্যাগ করেন। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনো করার পর তিনি আবার কাজে যোগ দেন এবং রান্নার কাজ শুরু করেন। পরে আসানসোলের বেকারি ও চায়ের দোকানে চাকরি নেন তিনি।

চায়ের দোকানে কাজ করার সময় তার পরিচয় হয় আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লাহ’র সাথে। দোকানে কাজ করার পাশাপাশি নজরুল কবিতা এবং ছড়া রচনা করতেন তা দেখে রফিজউল্লাহ মুগ্ধ হন। এবং ১৯১৪ সালে তিনি কবি নজরুল ইসলামকে দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন। পরবর্তীকালে ১৯১৫ সাল থেকে নজরুল আবার রানীগঞ্জে সিয়ারসোল রাজ স্কুলে চলে যান এবং সেখানে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন। সেখানে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তিনি বাংলা, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি সাহিত্য এবং হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত অধ্যয়ন করেন।

১৯১৭ সালে তিনি সেনা হিসাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং তিন বছর ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার পদে উন্নীত হন। ১৯১৯ সালে সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় তার “বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী” সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এছাড়াও সেইসময় তিনি আরও গল্প লিখেছিলেন হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে”।

১৯২০ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেনাবাহিনী কর্ম ত্যাগ করেন এবং কলকাতায় ফিরে কলেজ স্ট্রীটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির যোগদান করেন। যেখানে তিনি তার প্রথম কবিতা লেখেন ‘বাঁধন-হারা’।
১৯২১ সালে তিনি দৌলতপুরে একজন প্রখ্যাত মুসলিম গ্রন্থ প্রকাশক আলী আকবর খানের শালি নার্গিসের সাথে বাগদান করেন। বিয়ের দিন, আলী আকবর খানের একটি অযৌক্তিক অবস্থা শুনে তিনি অনুষ্ঠান থেকে দূরে চলে যান।

১৯২২ সালে কুমিল্লা শহর সফরে তিনি এক তরুণ হিন্দু মহিলা প্রমিলা দেবীর সঙ্গে দেখা হয়। তারা প্রেমে পড়ে এবং পরে ১৯২৪ সালে দুইজনে বিয়ে করেন। প্রমিলা দেবী এবং কাজী নজরুল ইসলামের সন্তানের ছিলেন কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ|

১৯২১ সালে অক্টোবর মাসে বোলপুরের শান্তিনিকেতনে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেখা হয় এবং তখন থেকে প্রায় কুড়ি বছর এই দুই কবির মধ্যে যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ থাকে। তারা দুজনে একে অপরকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন এবং ভালোবাসতেন।১৯২২ সালে তিনি বিদ্রোহী শিরোনাম কবিতা লিখেছিলেন যা “বিজলি” ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। এটি লেখার পরই তিনি বিদ্রোহী কবি উপাধী পান।

১৯২২ সালের ৮ ই সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ রাজনৈতিক কবিতা হওয়ার অপরাধে ইংরেজরা এটিকে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে এবং একই বছরের ২৩ নভেম্বর তার ‘যুগবাণী’ প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং একই দিনে তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯২৩ সালে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে জবানবন্দি দেন যা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে বাংলা সাহিত্যের এক সম্পদ বলে সাহিত্যিক মহলে স্বীকৃত। প্রহসনের বিচারে কবির ১ বছরের সাজা হয়। জেলে থাকার সময়েও ইংরেজদের অন্যায়ের প্রতিবাদে তিনি শুরু করেন আমরণ অনশন। নজরুলের কারাদণ্ড হলে নজরুল প্রেসিডেন্সী জেলে আছেন মনে করে রবীন্দ্রনাথ চিন্তিত হয়ে তাঁকে ‘Give up hunger strike, our literature claims you’ বলে যে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন, জেলার সে টেলিগ্রাম নজরুলকে দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।

রবীন্দ্রনাথ চিন্তিত হয়ে পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একটি চিঠি লেখেন। এটি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ঐতিহাসিক চিঠি ছিল-

কল্যাণীয়েষু রথী,

নজরুল ইসলামকে Presidency Jail এর ঠিকানায় টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলুম। লিখেছিলুম ‘Give up hunger strike, our literature claims you’। জেল থেকে Memo এসেছে The addressee not found; অর্থাৎ ওরা আমার message দিতে চায় না। কেননা, নজরুল প্রেসিডেন্সী জেলে না থাকলেও ওরা নিশ্চয় জানে সে কোথায় আছে। অতএব, নজরুল ইসলামের আত্মহত্যায় ওরা বাধা দিতে চায় না।

শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবি ঠাকুর পাঠানো টেলিগ্রামের শব্দগুলোকে নিয়ে চিন্তা করলে সহজেই বোঝা যায় নজরুলকে তিনি কতটা পছন্দ করতেন।

১৯২৩ সালে ডিসেম্বর মাসে মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কারাবন্দী থাকাকালীন প্রচুর সংখ্যক কবিতা ও গান রচনা করেছিলেন।

অবশেষে, তিনি “খিলাফত” আন্দোলন এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সমালোচক হয়েছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা না নেওয়ার জন্য। তিনি জনগণকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এবং ‘শ্রমিক প্রজা স্বরাজ দল’ সংগঠিত করেছিলেন।

১৯২৬ সাল থেকে তিনি সমাজের দুর্বল অংশের জন্য কবিতা এবং গান রচনা করেছিলেন। পরবর্তীকালে তার রচনাগুলি বিদ্রোহ থেকে ধর্মে রূপান্তরিত হয়েছিল। ১৯৩৩ সালে তিনি ‘আধুনিক বিশ্ব সাহিত্য’ শীর্ষক রচনা সংকলন প্রকাশ করেছিলেন, যার বিভিন্ন থিম এবং শৈলী ছিল। তিনি ১০ খণ্ডে শাস্ত্রীয় রাগ, কীর্তন এবং দেশাত্মবোধক গানের উপর ভিত্তি করে ৮০০ টি গান লিখেছিলেন।
১৯২৮ সালে তিনি ‘মাস্টার ভয়েস গ্রামোফোন সংস্থা’ এর গীতিকার, সুরকার এবং সংগীত পরিচালক হয়েছিলেন। ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর অন্যতম বৃহত্তম কাজ ছিল ‘সিরাজ-উদ-দৌলা’ নামে একটি বায়োপিক নাটকের জন্য গান রচনা এবং পরিচালনা করা।

১৯৩৪ সালে তিনি ভারতীয় থিয়েটার এবং ফিল্মে যোগদান করেন। গিরিশচন্দ্রের গল্প জীবনীর উপরে “ভক্ত ধ্রুব” নামে একটি ছবি প্রকাশ করেন। ১৯৩৯ সালে তিনি কলকাতা বেতারের জন্য কাজ শুরু করেন এবং ‘হারমনি’ এবং ‘নবরাগ-মালিকা’ এর মতো সংগীত প্রযোজনা করেন। ১৯৪০ সালে, তিনি এ.কে. প্রতিষ্ঠিত ‘নবযুগ’-এর প্রধান সম্পাদক হিসাবে কাজ শুরু করেন।

তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনাগুলি ছিল তাঁর বোধন, শাত-ইল-আরব,খেয়া-পারের তরণী এবং বাদল প্রাতের শরাব প্রভৃতি বিদ্রোহী কবিতাগুলি যা সর্বত্র সমালোচিত প্রশংসা পেয়েছিল।

১৯৪৫ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে কাজের জন্য জগত্তারিণী স্বর্ণপদক লাভ করেন।
১৯৬০ সালে তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণে পুরষ্কার পেয়েছিলেন।
তিনি বাংলাদেশের সরকার কাছ থেকে “জাতীয় কবি” উপাধি এবং ‘একুশ পদক’ পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৫২ সালে কাজী নজরুল ইসলামকে রাঁচির একটি মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং তারপরে ভিয়েনায় চিকিত্সার জন্য স্থানান্তরিত করা হয় যেখানে তাকে পিক্‌স নামক রোগ ধরা পড়ে। তিনি ১৯৫৩ সালে দেশে ফিরে এসেছিলেন।

স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাংলাদেশে তার বসবাসের ব্যবস্থা করেন এবং ধানমন্ডিতে কবির জন্য একটি বাড়ি প্রদান করেন।

১৯৭৬ সালে ২৯ আগস্ট বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে একটি মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করা হয়।
এখানেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।

তথ্যসূত্র:
বাংলাপিডিয়া, গুগল, উইকিপিডিয়া, বাংলা টিব্রিউন।

Name of author

Name: সুপ্রিয়া বিশ্বাস

One Reply to “জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা”

মন্তব্য করুন