জলছবি প্রকাশন

সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান

Home » একটি হলুদ বর্ণের সকাল

একটি হলুদ বর্ণের সকাল

আমি যখন বুড়ো হয়ে যাব, মাথার চুলগুলো যখন সাদা হয়ে যাবে তখন আমাকে নিয়ে থাকতে পারবে তো? এই প্রশ্নটি আমাকে আরও একবার করা হয়েছিল তখন আমার বয়স এগারো বছর।আমি হেসে বলেছিলাম কী বলছ কাকু! তুমি বুড়ো হলে তোমাকে ছেড়ে কোথায় যাব? তুমিই বা আমাদের ছেড়ে কোথায় যাবে? সব মানুষই তো একদিন বুড়ো হবে,তুমি, আমি মা- বাবা সবাই। দেখো না আমার দাদু কেমন বুড়ো হয়ে গেছে? আমি হাসছি কিন্তু কাকু হাসছেন না! কাকুকে হাসাতে আমি বলে উঠলাম আচ্ছা আচ্ছা না হয় তোমাকে তখন দাদু বলে ডাকব! এবার কাকু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ঈষৎ হেসে বললেন, “বোকা মেয়ে!” আবার যখন একই প্রশ্নের সন্মুখীন হলাম আমার বয়স পনের। কেন যেন এবার আমি হাসতে পারলাম না! আমার খুব ইচ্ছে করছিল কাকুর চোখের দিকে তাকাতে কিন্তু সেটাও পারছিলাম না! মনে হচ্ছিল ছুটে পালাতে পারলে বেঁচে যেতাম কিন্তু পা দু’টো অসার মনে হতে লাগলো! কাকু এবার মাথায় হাত রাখলেন না! আমার চিবুক উঁচু করে বললেন জবাব দিচ্ছিস না যে? আমি তাকিয়ে দেখলাম উনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম চোখ দুটো বেশ লাল! মনে হচ্ছে কত রাত ঘুমান নি! আমার কিছুটা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে এক আকাশ বিষ্ময় যোগ করতে তার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল । আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না! তিনি চলে গেলেন।
গল্পের এখানটায় থেমে গেল অনীতা কারণ সে নিজেই ঘামছে। বিছানার পাশে সাইট টেবিলে রাখা পানির
গ্লাসের দিকে তাকাতেই পলক পানির গ্লাসটি বাড়িয়ে দিলো অনীতাকে।

     পলক অনীতার স্বামী। আজ বিকেল তিনটায় বেশ ঘটা করে পারিবারিকভাবেই ওদের রেজিস্ট্রি বিয়ে হয়েছে । বিয়েতে অনীতার মত ছিল না! পলকের বাবা একটি অনুষ্ঠানে অনীতাকে দেখে পছন্দ করেছিলেন । প্রস্তাব পাঠালে  অভিভাবকরা বেশ খুশি  থাকলেও অনীতা বেঁকে বসলো। অবশ্য অনীতা এর আগেও এমনটা করেছে। পৃথিবীর কোনো ছেলেই তার পছন্দ নয়।  ব্যপারটা জানার পর থেকে পলকের মনে এক ধরনের জেদ চেপে বসে এবং পলক তার পরিবারকে জানিয়ে দেয়  জীবনে বিয়ে করতে হলে সে এই মেয়েকেই করবে।

তারপর দু’বছর কেটে গেছে যত সম্মন্ধই এসেছে পলক কোথাও বিয়েতে রাজি হয়নি!
পলক অভিজাত ও প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে; তবুও সে কোনো প্রকার বল প্রয়োগ না করে অনীতার জন্য অপেক্ষা করে আছে।
নানা ভাবে খোঁজ-খবর নিয়েছে যে মেয়েটির অন্যত্র কোনো পছন্দ আছে কি না। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর অনীতা কেনো পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছে তাও জানা গেল না! তবে একটি ভয়ঙ্কর রকমের তথ্য জানা গিয়েছে তার নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকে কিন্তু পলক সেটাতে গা করেনি।
পলক আর অনীতাদের বাড়ি খুব কাছাকাছি না হলেও একই শহরে। অনীতার সঙ্গ কথা বলার সুযোগ না হলেও বাড়ির বাইরে দু’একবার দেখার সুযোগ হয়েছে তাকে। সুন্দর বলতে যা বুঝায়, মেয়েটি সত্যিই তাই-সত্যিই অপরূপা অনীতা।
এর পর হঠাৎ করেই একদিন পলক জানতে পারে অনীতা বিয়েতে মত দিয়েছে এবং দু’পক্ষের আলোচনায় দিনক্ষণ ঠি করা হয়।
বিয়ের বাকি আর মাত্র দশদিন- কিন্তু পলকের সময় যেন কাটছিল না! পলকের প্রথম প্রশ্ন মেয়েটির কীসের এত অহংকার! পলক নিজে দেখতে সুদর্শন উচ্চশিক্ষিত, বিত্তবান এবং অভিজাত পরিবারের একমাত্র সন্তান এবং ভালো একটি জব করছে। তারপরেও পলকের প্রতি তার আগ্রহ নেই কেনো! পড়াশোনায়ও তার বন্ধ রয়েছে! তাহলে কি সে অতিশয় রূপবতী এটিই তার অহংকার! অদম্য কৌতূহল ধৈর্যের তলানিতে রেখে অপেক্ষার শেষ হলো আজ।

অনীতা এক নিঃশ্বাসে গ্লাসের পানি শেষ করতেই পলক গ্লাসটি ধরে ফেলল, অনেকটা বাচ্চাদের পানি খাওয়ানোর মতো! যেন কিছুটা বাড়তি যত্ন। গ্লাসটা রেখে পলক ওয়াশরুমে ঢুকে চোখে মুখে পানির ঝাঁপটা দিয়ে ধীরপায়ে শোবার ঘর সংলগ্ন বারান্দায় চলে গেল। রেলিংয়ে ভর দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবতে চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই অনীতার গোলাপি রংএর টোল পড়া মুখখানা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছে না! টোলপরা গালে মেয়েটাকে হাসলে না জানি কতটা সুন্দর লাগবে!
অস্থির আনমনা ভঙ্গিতে বিদঘুটে একটি গল্প বলে যাচ্ছে তবুও তাকে মায়বি এক রাজকন্যার মত লাগছে! রূপ সৌন্দর্যে কী এক মোহমায়া! হঠাৎ করেই এখন অনীতার ব্যপারে যে ভয়ঙ্কর তথ্যটি আগে শুনেছিল সেটা পলকের মনে পরে যাওয়ায় অনীতার বলা গল্পের প্লটের সাথে মিশে তার ভিতর সাত মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়ে গেল ! অনীতাকে পাবার জন্য অপেক্ষার যে ঝড়ের গতিবেগ ছিল তা উল্টো দিকে বেশিমাত্রায় বইতে লাগল। একটু আগেও আকাশটা কত পরিস্কার ছিল কিন্তু এখন কেমন যেন কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে!
ঘরের ভিতরে বিকট শব্দে কিছু একটা ভাঙার শব্দ শুনতে পেল পলক!
অতপর একটু তাড়াতাড়ি শোবার ঘরে প্রবেশ করে দেখতে পেল কোনো কারণে পানির গ্লাসটি মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেছে। অনীতা উবু হয়ে মেঝে পরিস্কার করার চেষ্টা করছে। পলক বাধা দিয়ে নিজেই পরিস্কারের ভূমিকায় লেগে গেল ।
অনীতা কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে বিছানার উপর। পলক কাজ শেষ করে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত তিনটে পঁয়ত্রিশ! অনীতাকে ওয়াশরুম দেখিয়ে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়তে বলল। আরো বলল, আমি পাশের রুমেই আছি, গল্পের বাকিটা না হয় কাল শুনব-সারাদিন অনেক ধকল গিয়েছে, তোমার বিশ্রাম দরকার। বাতিটা চাইলে নেভাতে পারো অথবা তোমার যেমন ইচ্ছে!
অনীতার নিরবতায় পলক কতটা আহত হলো বুঝা গেল না! কিন্তু অনীতা যখন তার রুমের দরজাটা বন্ধ করল তখন পলকের ভেতরটা খানিক ঝলসে গেল বৈ কি!
পলক ঘুমাতে পারল না! ফজরের আযানের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। নামাজ শেষে বোধকরি খানেকটা ঘুমিয়ে গিয়েছিল। অনীতা ঘুমালো কি না পলকের জানা হলো না।

প্রকৃতি যেন মেতেছে বসন্ত আয়োজনে! সকালটাকে সূর্যের আলো কেমন হলুদ বর্ণের করে রেখেছে! কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোতে উপচে পড়ছে লাল রঙ। পাখির কূজনে মুখরিত চারপাশ! গাঢ়সবুজ রঙের ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে নগ্ন পায়ে হেঁটে যাচ্ছে অনীতা। তার সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় কফিনের মতো দেখতে একটি সাদা বাক্স। খুব কাছে থেকে এটাকে কফিনের মতো মনে হয় না! এটি একটি দরজার মত। ডালা খুলে অনীতা যখন ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছে তখনই এক ঝটকা আলো চোখে এসে পড়ল! অনীতার ঘুম ভেঙে গেছে!, বাইরে ঝলমলে সূর্যের আলো, তার খানিকটা জানালার পর্দা গলে বিছানায় অনীতার মুখের উপর পড়েছে।
এতক্ষণ সে যে স্বপ্ন দেখছিল বুঝতে পারল। নতুন পরিবেশ এটা ভেবে লজ্জিত ভঙ্গিতে উঠে বসল। এই স্বপ্নটা অনীতা প্রায়ই দেখে , আজ দেখল অনেকদিন পর। আজ স্বপ্নটি বেশি দূর এগোয়নি, অন্যসময় সে দরজা দিয়ে মাটির নিচে রাস্তা পায়। ভিতরে চলে গেলে ছিমছাম গোছানো একটি বাড়ি, প্রথমে ঝকঝকে আলো তারপর ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসে! সেখান থেকে বের হবার পথ না পেয়ে চিৎকার করতে থাকে তখন ঘুম ভেঙে যায়।
এই ভয়ংকর স্বপ্নটির কথা সে কখনো কাউকে বলেনি! দিনে দিনে স্বপ্নটি তার আপন হয়ে উঠছে। স্বপ্নের এই বাড়িটি তার খুব চেনা। আজ মনে মনে ভাবছে, গল্প বলার সময় পলককে এই স্বপ্নের কথাটা বলবে।
পলক নক করছে…অনীতা রুমের দরজা খুলে দিলো। অনীতা যেমন রাতের কথা পলকের কাছে জানতে চায়নি, পলকও না! পলক তড়িঘড়ি তার পার্সোনাল দুই-একটি জিনিস রুম থেকে নিয়ে বেরিয়ে পরার আগে অনীতাকে বলল, বাড়িভর্তি মেহমান, জানো তো আজ বাড়িতে আমাদের বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান? সারাদিন হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করো। একটু পর পার্লার থেকে লোক আসবে তুমি ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নাও। কথা শেষ করে পলক বেরিয়ে যায়। অনীতা কিছু বলতে চায়নি অথবা বলার সুযোগ পায়নি।
দিনভর বাড়ির লোকজন আনন্দ-উল্লাস আর হৈ-হুল্লোড়ে মেতে থাকলেও তার ছিটেফুটো এই নতুন দম্পতির ভেতরে দোলা দিয়েছে কি না, কেউ জানতে পারল না!
ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে ক্যামেরাবন্দি হয়েছে এটা ঠিক কিন্তু দু’জনের তেমন কোনো কথা হয়নি! অনীতার বাবা-মা ও একমাত্র ছোট বোনটিও এসেছিল। পলককে অনীতার বাবার সাথে একান্তে ঘনিষ্ঠ হয়ে কথা বলতেও দেখেছে অনীতা। তখন তার খুব ভালো লেগেছে কারণ বাবা-মাকে ছেড়ে আসার সময় বাবার মুখখানা কেমন অসহায় লাগছিল! ছোটবোন ও মা খুব কাঁদছিল কিন্তু অনীতার মন খারাপ থাকলেও কাঁদেনি। আজ অবশ্য সবাই বেশ হাসি খুশি ছিল।
সারাদিনের ঝুটঝামেলা শেষে সন্ধ্যার পর সবাই যার যার মতো করে বিশ্রাম নিচ্ছে। অনীতা ঘরে কিন্তু পলক ছাদে হাঁটাহাঁটি করছে। স্মোকিংয়ের কোনো অভ্যাস পলকের নেই, কলেজ -ভারসিটিতে পড়ার সময় দু-একবার বন্ধুদের সাথে একটু-আধটু হয়েছে এই যা; কিন্তু আজ চেইন স্মোকারদের মতো সিগারেট টেনে যাচ্ছে একটার পর একটা।
অদম্য এক অস্থিরতা কুরে কুরে খাচ্ছে ভিতরটা!
আজ অনীতার বাবার সাথে কথা বলার সময় কায়দা করে পলক কিছু তথ্য বের করার চেষ্টা করেছে; যেমন-
অনীতা কথা খুব কম বলে তাই না বাবা?
বাবা বললেন, হ্যাঁ বাবা, ও একটু কথা কম বলে।
পলক যখন বলল, সে কি কোনো কারণে ডিপ্রেসড থাকে?
বাবা একটু চমকে গিয়ে বললেন, কেনো ও কেমন আছে?
পলক মুখে হাসি টেনে বলল, না না বাবা তেমন কিছু নয়! পলক খেয়াল করল অত্যন্ত স্মার্ট একজন মানুষের চেহারা কীভাবে পাংশু হয়ে যায়।
পলক মনে মনে একটি গালি আওড়াতে চেয়ে অতি ভদ্রতায় হজম করে ফেলল! সেই কথা মনে করে পলকের এখনও ভীষণ রাগ হচ্ছে!
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামতে শুরু করেছে। পলকদের বাড়িটা ছবির মতন সুন্দর ! রাতে আকাশে চাঁদ থাকলে আরো সুন্দর লাগে। তিনতলা এই বাড়িটিতে পলকের বাবা- মা থাকেন দোতলায় আর পলক তিনতলায়। খাবারের ব্যবস্থা দোতলাতেই আর নিচতলায় গ্যারেজ আর বিশাল ড্রয়িংরুম।
বাড়ির সামনে বাগান পেছনে ফাঁকা জায়গাসহ পুকুর, বকুল ও কৃষ্ণচূড়া গাছ ছাড়াও নানা রকম ফলের গাছ আছে। পলক তাকিয়ে আছে পুকুরের স্বচ্ছ পানির দিকে। ছাদের উপর থেকেই তার পানিতে ঢিল ছুঁড়তে ইচ্ছে করছে। ছোটবেলায় মা বকে দিলে গাছের নিচে বসে পানিতে ঢিল ছুঁড়তে ছুঁড়তে অভিমান কমে যেত। কিন্তু আজ খুব অসহায় লাগছে নিজেকে! তবুও সৌর্যদীপ্ত পৌরষবোধটুকু নিজের ভেতর সমর্পিত করে অনীতার কাছে গেল।

               একটু আগেই শাওয়ার নিয়েছে অনীতা। তাকে দেখতে এখন  শিশির-ভেজা গোলাপের মতো লাগছে। পলকদের বাড়িতে মা ছাড়া মেয়েমানুষ নেই। শাওয়ার নেওয়ার পর আধভেজা চুলে একটা মেয়েকে দেখতে এতটা ভালোলাগে, পলকের চোখে পরেনি।  আজ সারাদিন যখন  ভারি সাজে সেজেছিল- তখনও অনেক ভালো লেগেছে কিন্তু এখন তাকে অন্যরকম ভালো লাগছে। অতিমাত্রায় সুন্দরের পাশে কোনো অসুন্দর সত্যিই বেমানান। তাই গুমোট পরিবেশ সরিয়ে নিরবতা ভাঙতে পলক কথা খুঁজতে লাগল।
  • আজ সারাদিন কেমন কেটেছে অনীতা? শরীর ঠিক আছে তো? মা-বাবার জন্য কি মন খারাপ হচ্ছে?
    অনীতার জবাব সংক্ষিপ্ত-না, ভালো আছি। আপনি কোথায় ছিলেন এতক্ষণ?
    এমন প্রশ্নের জন্য পলক তৈরি ছিল না! তাছাড়া সম্বোধনটায়ও একটু ধাক্কা লাগলো বুকের ভেতর।
    পলক উত্তর এড়িয়ে গেল না। বলল- ছাদে ছিলাম, আমাদের ছাদটা খুব সুন্দর! সকাল- বিকাল চাইলে হাঁটাহাটি করতে পারবে তুমি।
    ছাদ নিয়ে অনীতার আগ্রহ না থাকলেও গল্প বলাতে আগ্রহ আছে বুঝতে পারল পলক। এই মুহূর্তে পলকের মনে বড় প্রশ্ন অনীতার বাবার কোনো ভাই-বোন নেই; তাহলে ওই কাকুটা কোন কাকু! খুব নরম গলায় বলল, অনীতা বলবে আমায়, তোমার কাকুটা কে?
    অনীতা দম নিয়ে শুরু করলো-
    ‘আমি যখন খুব ছোট-মানে ৭/৮ বছরের, তখন এই ভদ্রলোককে আমাদের বাসায় আসতে দেখি। বাবা আমাদের ডেকে পরিচয় করিয়ে দেন। আমার বাবা সার্ভিসহোল্ডার; তারপরেও তার সাথে সাইড বিসনেসে জড়িত ছিলেন। ভদ্রলোকের নাম জাহিদুল হাসান। একবাক্য অতি সুদর্শন একজন মানুষ। তার আচার-ব্যবহারে যে কোনো মানুষ মুগ্ধ হয়ে যেত। সেই সাথে তিনি অসম্ভব প্রতিভাবানও ছিলেন। তাঁর লেখা গল্প-কবিতার প্রচুর বই বাজারে তখন। বয়সে আমার বাবার থেকে বড় কিন্ত তিনি ছিলেন চিরকুমার। দিনে দিনে তিনি আমাদের এতটাই আপন হয়ে উঠেন যে, তিনি তার ভাড়া বাসা ছেড়ে আমাদের বাসার একটি ফ্ল্যাটে প্রথমে ভাড়ায় এবং পরে এমনিতেই থাকতে শুরু করেন। কারণ বাবা ভাড়া নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। উনার অবাধ আসা-যাওয়া ছিল আমাদের ঘরে। আমরাও তাকে পরিবারের একজন করে নিই। উনি আমাদের এতটাই খোঁজ-খবর রাখতেন যে, পড়াশোনা থেকে সবকিছু। কাকু আমাকে নিয়োমিত পড়াতেন। আদব-কায়দা, ভালোভাবে কথা বলা, গল্পবলা, সব স্টাইল তার কাছে যতটা শিখেছি, ততটা বাবা-মায়ের কাছে শিখতে পারিনি! খেলাধুলা, গান শেখাসহ সব বিষয়ে তিনি আমার সকল কাজের উৎসাহ যোগাতেন। শাসন যে করতেন না তা নয়, সেটা ছিল যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে। তিনি রাজনীতিতে ছিলেন, কিন্তু তখন জেনারেল জিয়ার শাসন আমল হওয়ায় তিনি নিরব থাকতেন। তাঁর কাছে ৭১-এর অনেক গল্প শুনেছি। যখন আরো একটু বড় হয়েছি, আমি আমার বন্ধুদেরও বাসায় নিয়ে আসতাম তার সাথে পরিচিত হতে। আমার বাবাও তাকে অসম্ভব পছন্দ করতেন এবং নিজের বড় ভাইয়ের মত জানতেন। কিন্ত মা এসব খুব একটা পছন্দ করতেন না! বাবা বলতেন পরিবার থেকে বিছিন্ন একটা মানুষ আমাদের বাচ্চাদের আদর করে হয়ত শান্তি পায়-থাক না। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স এখন তো আর সংসারের চিন্তা করবেন না। মা বললেন তো উনি এই চিরকুমারের ঢঙ ধরেছেন কেন? বাবা বললেন, একটা মেয়েকে পছন্দ ছিল, পায়নি তাই।
  • তার মা-বাবা কেউ নেই?
  • আছে তো, বাবা নেই, মা আছেন; যোগাযোগ নেই। ভাইবোনরা দেশের বাইরে থাকে। পরিবার ছেড়েছেন অনেক বছর আগে।
    এরপর থেকে আমার মা কখনো বাবাকে কিছু বলেননি।
    মাঝে মাঝে আমাকে রাগ দেখাতেন মা। আমি রাগের কোনো কারণ খুঁজে পেতাম না!
    ধীরে ধীরে কাকুর স্নেহ- মমতায় যতটা কাকুর প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পরেছিলাম ; বাবা-মায়ের প্রতি ততটাই দূরত্ব তৈরি হয়েছিল! হঠাৎ একদিন বিকেলবেলা ছাদে গিয়ে তাকে দেখতে পাই রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি দৌড়ে তার কাছে যাই কারণ গত দুই-তিনদিন ধরে কোনো কারণ ছাড়াই তার সাথে আমার দেখা হচ্ছিল না। আমি এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত আর তিনি বাসায় ফিরছিলেন সারাদিন শেষে অনেকটা রাত করে। একটু বড় হয়েছি বলে রাতে আর দেখা করতে যেতাম না মায়ের ভয়ে। তাই হঠাৎ দেখতে পেয়ে একটু ছুটেই গেলাম কাছে।
    চরম উৎকন্ঠা নিয়ে পলক বলল, তারপর?
    অনীতা তখনও বেশ শান্ত ও স্থির ভঙ্গিতেই বলে চলেছে,
    -তারপর?
    আমি আমার স্বভাবসুলভ ঢঙে বললাম, -কী ব্যপার কাকু? কোথায় থাকো আজকাল? দু’দিন কোনো দেখা নেই যে!
    কাকু আমার কথার জবাব দিলেন না! তিনি যে কথাটি বললেন, তা আমি গল্পের শুরুতে বলেছি। তিনি আমাকে ছাদে রেখে দ্রুত তার ঘরে ফিরে গেলেন।
    কাকু আমাদের পাশেই ছোট একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন।
    দুনিয়া ভেঙে কান্না পেল আমার! তার কথার কোনো জবাব আমার কাছে ছিল না! আমি কী বলতে পারতাম তাকে! তিনি আমার চোখে দেবতার মত মানুষ। কিন্তু তার বদলে যাওয়াটা?
    পাশাপাশি দুটো জিনিস আমি নিতে পারছিলাম না! কখন ঘরে ফিরেছিলাম মনে নেই! রাতে ঘুমাতে পারলাম না! ভেতরে ভেতরে ভীষণরকম ছটফট করছিলাম। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল, কাকু তুমি তোমার কথাটা ফিরিয়ে নাও, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি! আমার সেই আর্তচিৎকার প্রতিধ্বনিত হলো নিজের ভেতর। পরেরদিন বাসায় জানলাম তিনি কলকাতা যাচ্ছেন ফিরতে দেরি হবে।
    আমার ভেতর কিছুটা স্বস্তি এলো।
    যাক অন্তত তার সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে না।
    কিন্তু আমার এ স্বস্তি, স্বস্তি থাকল না!
    তিনি চলে যাবার পর আমি অবচেতন মনেই তার ঘরে ঢুকলাম, বিছানায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল কিছু বই। তিনি খুব গোছানো মানুষ ছিলেন অথচ পুরো ঘরটি বেশ এলোমেলো দেখে অবাক হলাম! বিছানায় বালিশের পাশে একটি ডাইরি আমার চোখে পড়ল। আমি পাতা উল্টালাম,পুরো ডাইরি ফাঁকা, শুধু একটি পাতায় লেখা আছে আমি মহামানব নই!
  • আমাতে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে পাপবোধ!
    তাই আমি নুতন করে বাঁচার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিলাম! ভালো থাকিস।
    আমি সীমাহীন অস্থিরতায় নিষ্পেষিত হতে লাগলাম! চারপাশে অসীম শূন্যতা, ঘৃণা, ভয়, সন্দেহ, আর অবিশ্বাস আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল! কথাগুলো কাউকে শেয়ার করতে পারিনি! ধীরে ধীরে বহির্জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের ভেতর বসবাস করতে লাগলাম।
    ডাক্তাররা আমার রোগের নাম দিলেন ‘অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার ‘।
    সে বছর আমার পরীক্ষা দেওয়া হলো না!
    আমি যেহেতু কাউকে বিষয়টি শেয়ার করিনি, ডাক্তাররা তথ্য না পেয়ে আমাকে সুচিকিৎসা দিতে পারেননি!
    আমার জীবন থেকে ছয়টি মাস আঁধারে ঢাকা পরে গেল; যা নাকি আমি জানলাম না!
    কিছুটা যখন সুস্থ হলাম, স্কুল-কলেজ, বাসা মিলে কোনোরকম দিন যেত। আমার মন খারাপের দিনগুলোতে কাউকে পাশে পেতাম না!
    পরিবার থেকেও এক ধরনের অবহেলা ছিল!
    রাতে ঘুমাতে গেলে প্রায়ই একটি দুঃস্বপ্ন দেখতাম!

অনীতা তার সেই হলুদ বর্ণের সকাল, কৃষ্ণচূড়া গাছ, বাড়ি আর দরজা নিয়ে ঘুমের ভেতর যে স্বপ্নটি প্রায়ই দেখে চিৎকার করে; পলকের কাছে সেটিও বলল।
শেষ কথাগুলো বলতে বলতে অনীতার গলা ধরে এলো। বাঁধভাঙা প্লাবনের মত অঝরে কাঁদতে লাগল সে।
পলক অনীতাকে শিশুদের মত কাঁদতে দেখে তার সব রাগ, জেদ, অভিমান তরল অবস্থায় রেখে তাকে শান্ত করতে এগিয়ে এলো।
কিছু কিছু জৈবিক সম্পর্কের সহজাত প্রবৃত্তি কঠিন পরিস্থিতির দেয়াল ভাঙে স্বমহিমায়।
পলকের আয়োজনে হয়ত আজ অনীতা তাই একতাল কাদা।

রাতের গভীরতা ভেদ করে ডানা ঝাপটাচ্ছে দু’একটি রাতজাগা অবসন্ন পাখি। রাস্তার পাশে বেওয়ারিশ কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করছে কিছুটা উচ্চস্বরে!
পলকের ঘুম ভেঙে গেল।পাশেই অনীতা তলিয়ে আছে গভীরঘুমে। চোখে-মুখে কিছুটা ক্লান্তির ছাপ। জানালার পর্দা গলে আবছা চাঁদের আলো পড়ছে অনীতার গায়। কপালের উপর থেকে পরম মমতায় চুলগুলো সরাতে গিয়ে চমকে উঠল পলক! জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে অনীতার! পলক কিছু টা বিহ্বল হয়ে পড়ল! অনীতার ঘুম ভাঙানো উচিত কি না বুঝতে পারছে না! ঠান্ডা পানিতে টাওয়েল ভিজিয়ে কপালটা মুছে দিতে চাইলো কিন্তু তার আগেই জেগে উঠেছে অনীতা!
অবাক চোখে তাকিয়ে আছে পলক! অনীতাকে এমন দেখাচ্ছে কেনো! চোখগুলো রক্তের মত লাল, কেমন বড় বড় করে তাকিয়ে আছে! এ কোন অনীতা!
পলক বুঝতে পারল বড় বেশি ভুল করে ফেলেছে সে! মেয়েটি চরম অসুস্থ, তাকে আরো সময় দেওয়া দরকার ছিল আন্তরিক হতে। পলক অনীতাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলো কিন্তু অনীতা চিৎকার করে উঠল।অথচ এই মেয়েটি ঘুমোতে যাওয়ার আগে বলেছিল,পলক, আমার হাত দুটো ধরো, আমি কোথাও যেতে চাই না!
পলকের উৎকন্ঠার চেয়ে অনীতার জ্বর বেড়ে গেল অনেকগুণ বেশি।প্রায় সকাল হয়ে এসেছে। পলক তার বাবা মাকে ডাকল। অনীতাদের বাসায় খবর দেওয়া হলো কিন্তু অনীতা আর কাউকে দেখলো পেল না!
জগৎ-সংসার শরীরের অসুখে যতটা অস্থির হয়, যত্নশীল হয় মনের অসুখে ততটা নয়! অথচ এ এক কঠিন বাস্তবতা!
সবকিছু ছাপিয়ে পলক তার নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না! পলক ভাবে, আমি কেনো সবকিছু বুঝে উঠতে পারলাম না, আমি তার শেষ আশ্রয় ছিলাম! আমি তার যতটুকু জানলাম, পৃথিবীতে আর কেউ জানতে পারল না!
কালো আঁধারের ভেতর একরত্তি সময়ের সুখকর স্মৃতি বাকী জীবনের জন্য বুকের ভিতর ধারণ করল পলক।
একে একে বাবা-মা গত হলেন! সারিবদ্ধ কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো বড় হচ্ছে তাদের নিজেরমতো করে, দিন গড়িয়ে রাত আসে,রাত গড়িয়ে দিন।সবই চোখে পড়ে কিন্তু বুকের ভেতর যে ক্ষরণ তা কি দেখতে পায় কেউ?

আকাশে মেঘ নেই।সূর্য উঁকি দিয়েছে যথাসময়েই। ঝক্ঝকে সূর্যের আলোয় সকালটা হলুদ রঙে মাখামাখি। কৃষ্ণচূড়া বাগানের এক কোণে বেঞ্চের উপর বসে আছে তুষারশুভ্র চুলের একজন মানুষ! চোখের ঘোলা দৃষ্টিতে ওঁৎ পেতে আছে কোনো একটি সময় এবং কোনো একজন মানুষের জন্য অপেক্ষা! সে দিন-রাত্রির ব্যবধান বুঝে না! আজ তার কাছে স্বপ্ন আর বাস্তব পৃথক কিছু নয়। তার কাছে স্মৃতির কোনো পাতা নেই! তার চোখের সামনে মনের কল্পনায় একটি বিলবোর্ড আছে, সেখানে অনীতার ছবি আছে,বোর্ডে কি লেখা আছে সে দেখতে পায় না! আবছা দৃষ্টিতে লেখাগুলো পড়তে চায় কিন্তু পারে না! উদাস মনে অসংলগ্ন যে কথাগুলো আওড়ায় তার কোনো মানে হয় না!
অদূরে কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় সাদা রঙের যে কবরটি আছে ওইটি তার কাছে একটি দরজা। ওখানে দিন-রাত কড়া নাড়ে সে অবচেতন মনে। তার ধারণা একদিন দরজা খুলে হাত বাড়িয়ে অনীতা বলবে,
পলক ভেতরে এসো… একা একা আমার বড় বেশি ভয় লাগে…!
সমাপ্ত

Name of author

Name: আঞ্জুমান আরা খান

Short Bio: কবি, ছড়াকার ও কথাসাহিত্যিক সম্পাদক, জলছবি বাতায়ন সাহিত্য সম্পাদক, আজ আগামী ২৪ ডটকম প্রকাশিতব্য গ্রন্থ : শ্রেষ্ঠ অনুবাদ গল্প ফেসবুক আইডি : facebook.com/anjumanara.khan.587

One Reply to “একটি হলুদ বর্ণের সকাল”

মন্তব্য করুন