জলছবি প্রকাশন

সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান

Home » আধারে ঢাকা জীবন (শেষ পর্ব)

আধারে ঢাকা জীবন (শেষ পর্ব)

টেনসন আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে দিলরুবার।মাঝে মাঝে খবর আসে স্বামীর ভাল মন্দের।বিচলিত মন শান্তির নীড়ের অপক্ষেয়ায়।সেই কাঙ্খিত দিনটি আজ।আজ স্বামী মজনু মিয়ার মুখটি দেখবেন বহু দিন অপেক্ষার পর।কিন্তু কাঙ্খিত দিনটির জন্য তাকে টাকা জমা দিতে হবে আরো দেড় লক্ষ টাকা।টাকা সংগ্রহ করতে দিলরুবা তার ছেলে ও মেয়ের নামে সর্বোশেষ ব্যাংকে ডিপোজিট উত্তোলন করতে হবে।স্বামী স্ত্রী দুজনেই শপথ করেছিলেন জীবনে যত ঝড় তুফান আসুক ছেলে মেয়ের নামে জিপোজিটগুলো কখনো ভাঙবেনা না।ওদের বিশেষ কাজে তা ব্যাবহার করা হবে।উপায়ন্তর না পেয়ে দিলরুবা ব্যাংকে গিয়ে টাকাগুলো হাতে নিলেন।চোখের জল যেন আপনা আপনি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।

দিলরুবার পূর্ব কথা মতে তাদের সন্তানদের নিয়ে অপেক্ষা করছেন তার দুঃসময়ে অতি আপনজন খালাত বোন এবং তার স্বামী।ছেলে মেয়েরা মুখিয়ে আছে কখন তাদের বাবার প্রিয় মুখটি দেখবেন।অপেক্ষার সময় দীর্ঘ,তবুও যেন তাদের মন মানছে না কখন আসবে তাদের মা কখন বাবার স্পর্শে পাবে।অবশেষে টাকা নিয়ে এলেন।দিলরুবাকে দেখে তার সন্তানেরা তাকে জড়িয়ে ধরলেন।ছেলের হাতের স্পর্শ কনুয়ে পড়ার সাথে সাথে আৎকে উঠলেন মা।ছেলে তার কনুয় বরাবর দেখে রক্ত ঝড়ছে।
-মা কী হয়েছে?
-না কিছু না বাবা।পথে হাটতে গিয়ে পড়ে গিয়ে একটু ব্যাথা পেয়েছি।

অথচ তার চোখ মুখ শরিরের অবস্থা বলে দেয় সে বড় কোন ফারা হতে মরতে মরতে বেচে এসেছেন।দিলরুবা কনুই হতে ঝরা রক্তগুলো শাড়ীর আচলে মুছে টাকাগুলো জমা দিলেন ক্যাশে।অপেক্ষা এখন কখন স্বামী আইসিউ হতে বের হয়ে আসবেন।

কিছুক্ষণের মধ্যে মজনু মিয়াকে একটি হুইল চেয়ারে নিয়ে এলেন এক নার্স।বাবাকে দেখা মাত্র দৌড়ে গেলো তার সন্তানেরা।বাবা দূর হতেই ইশারা করলেন তোমরা একটু দুরেই থাকো।থমকে দাড়িয়ে গেলো তারা।এতো দিন পর বাবাকে কাছে  পেয়েও সন্তান পারছে না বাবার আদর পেতে,বাবা পারছেন না সন্তানদের পরম আদর সোহাগের সান্নিধ্য নিতে।পৃথিবীর বুকে মানবজাতি এ এক আজব সময়ে অতিবাহিত হচ্ছে।২০১৯ থেকে শুরু করে ২১,২২,২৩ সাল হয়তো তারও বেশী সময় এমনি করে পৃথিবীর মানুষ নিরান্দ,ভীবিষিকাময়,দূরত্বে জীবন যাপন করে চলবেন।যে সময়টায় আনন্দ প্রিয় মানুষ মানুষের মিলনে পাচ্ছে বাধা,মৃত্যুর ভয়ে কখনো কখনো জন্মদাতাদেরকেও করছেন অস্বীকার,লাশের মিছিল সমাধিতে কারো যেন সাহস নেই এগিয়ে গিয়ে সমাধিস্থ করার,পৃথবীর শ্রেষ্ট জীব হার মানছেন করোনা ভাইরাস নামক এক অভিসাপের কালো অধ্যায়।

খুব ধীর গতিতে দিলরুবা স্বামীর একটি হাত কাধে রেখে হাসপাতালের হুইল চেয়ার পরিবর্তন করে নিজস্ব হুইল চেয়ারে বসিয়ে হাসপাতাল হতে বের হলেন রাজপথে।

আজ কত দিন পর মজনু মিয়া খোলা আকাশ দেখলেন।বাহিরে ঘন মেঘের আড়ালে আলোর উকির রস্মিতে চোখ বুজে বুজে আসছিলো।আজকের পৃথিবীটা তার কাছে বেশ অন্য রকম লাগছে।গ্রাম্য শহরের পরিবেশ যেন পূর্বের ন্যায় আরো বেশী প্রকৃতির রূপে সেজে আছে।রাস্তাঘাটেও লোকজনের তেমন কোন উপস্থিতি নেই যেন শস্মানের নীরবতা।

রাজপথে কিছুক্ষণ স্থির দাড়িয়ে রইল দিলরুবা।হুইল চেয়ারে আইল কোন দিকে ঘুরাবেন কিংবা টেক্সি ডেকে কোথায় যাবেন ভাবছিলেন।এমন সময় স্বামী মজনু মিয়া ভাঙা ভাঙা শব্দে কথা বললেন।
-কী হলো থামলে কেন?বাড়ী চলো।আহা কতদিন আরাম করে ঘুমাইনা।দক্ষিনের জানালায় প্রবাহিত বাতাসের স্পর্শ পাই না।আচ্ছা আমার সেই সব কবুতরগুলো আছেতো নাকি আমায় বিহনে ওরা সব উড়ে গেছে অন্য কোথাও অন্য কোন আশ্রয়ে?

দিলরুবার চোখে জলের কণা ছল ছল করলে।স্বামীকে কী ভাবে বুঝাবেন যে সে বা তারা এখন গৃহহীন,অর্থহীন ফকির সমান।তার অনুপস্থিতে তাদের জীবনের সর্বোত্র উলোটপালট হয়ে গেছে।

যাত্রীবাহি গাড়ী ড্রাইভাররা এক এক সময়ে এক এক জন তাদের সামনে এসে জিঞ্জাসা করছেন।
-আপা কই যাইবেন?আমার গাড়ীতে চলেন।ভাড়া কম আছে।

আপার যেন কোন সাড়া শব্দ নেই।ঘরবাড়ীহীন জীবন ভেবে পাচ্ছে না স্বামীকে নিয়ে কোথায় উঠবেন।খালাত বোনের বাসায় এতো দিন সন্তানদের নিয়ে থেকেছেন।স্বামীকে নিয়েও তাদের বাসায় উঠবেন এ কেমন দেখায়।ভাবনায় তলিয়ে গেলেন দিলরুবা।মজনু মিয়া অনেক ক্ষণ যাবৎ লক্ষ্য করছেন দিলরুবার যেন আর পা চলছে না।

-কী হলো বাড়ি চলো!এখানেই থাকবে নাকী?
দিলরুবা মুখটি অন্য দিকে ঘুরিয়ে চোখের কোণে হতাশার জলের কণা বা হাতে মুছলেন তবুও কিছু বলছেন না।মজনু মিয়ার বুঝার আর বাকী রইলো না।

-গানটি শুনেছো তো-যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলোরে……একলা চলো।তেমনি যদি তোর বাড়িঘর কিছুই না থাকেরে পাগলা তবে খোলা আকাশের নীচে চলোরে…নীচে চলো।

করোনার ভয়াবহ থাবায় শুধু যে মজনু দিলরুবার জীবনকে উলোটপালোট করেছে তা কিন্তু নয়।করোনার থাবা হতে বাচতে লকডাউন এর সিস্টেমে বিশ্ব তথা এদেশের অসংখ্য মানুষের জীবন জীবিকাকে শুন্যের কোটায় নামিয়ে দিয়েছে।বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবার যারা না পারতেন কারো কাছে হাত পাততে না পারছেন কাউকে কিছু বলতে।কয়দিন আগেও আলো ঝলমলে যে সংসারটি ছিলো তা করোনায় অন্ধকারে তলিয়ে যায়।সময়ের ব্যাবধানে একদিন এ অন্ধকার বিলীন হয়ে আবারো আলোয় আলোকিত হবে পৃথিবী।আবারো মানব জীবনে ফিরে আসবে স্বস্তি,কর্ম চঞ্চলতায় ফিরে পাবে প্রান।

প্রথম পর্ব

Name of author

Name: মনির হোসেন মমি

৪ Replies to “আধারে ঢাকা জীবন (শেষ পর্ব)”

মন্তব্য করুন