অনেক কথা (পর্ব ৩)

চিরন্তন কথা—

কিছু কিছু সত্য খুব তিক্ত হয়। যেখানে এধরণের সত্যের তিক্ততা রয়েছে সেখানে মিথ্যাকেই পথ দেওয়া ভালো। কারণ, এমন কিছু সত্য—যা প্রকাশ করলে রক্তপাতের আশঙ্কা বা কারো জিন্দেগি বিপন্ন কিবা বিরান হতে পারে, এমন সত্যের সামনে মিথ্যাকেই গ্রাহ্য করা মঙ্গলের কাজ। কথায় আছে, একটা অপরাধে যদি দশটা উপকার হয় এবং দশটা অপরাধে যদি পুরো জাতির মঙ্গল হয়, তা হলে সেই অপরাধ ক্ষমার যোগ্য। একের কষ্টে যেখানে দশের কষ্ট, সেখানে মিথ্যাই যদি মঙ্গল—তবে মিথ্যাকেই সত্যরূপে মেনে নেওয়া উত্তম। এরূপ মিথ্যার কাছে নুয়ে যাওয়া সত্যের পরাজয় নয়। ক্ষতির চেয়ে মীমাংসা উত্তম। যারা মীমাংসা মেনে নিতে পারে না তারা ক্ষতির থেকে বাঁচতে পারে না। ‘সত্য’ ‘সত্য’ করে গলা ফাটালে যেমন মিথ্যা কখনো সত্য হয়ে যায় না, তেমনি মিথ্যার জোরে সত্যকেও কখনো দাফন করা যায় না। বিধির বিধান আসল জায়গাতেই স্থির থাকে। আমাদের কাজ ও কথা বা স্থান পরিবর্তন হয় বলে আমরা কেউই আসলে সত্যবাদী না। আমরা আসলেই মিথ্যুক—বিবাদী। বিবাদ আমাদের ধর্ম। সবাই-ই প্রতিদিন কিছু-না-কিছু—কার কাছে না কার কাছে সত্য বা সততার অভিনয় করি! মানুষ এমন এক জাতি, হিংসার আগুনে সারা জীবন জ্বলেপোড়ে ছারখার হতে পারে কিন্তু সামান্য একটু ভালবাসার বণ্টনে এতটুকুন পথ চলতে পারে না। এটাই মানুষের ধর্ম এবং এটাই মানুষের কীর্তি! আর এটার একমাত্র কারণ হলো হয়ত—ধোঁকা। মানুষ ধোঁকা খেতে খেতে একসময় নিজেই ধোঁকাবাজে পরিণত হয়। দুনিয়ার অভিধানে বোধহয় ‘ধোঁকা’ শব্দ না থাকলে ‘মিথ্যা’ শব্দও থাকত না।

 

‘আপদ কেটে গেলে আমি নিরাপদ’ তবে সবক্ষেত্রে বিপদ ডিঙিয়ে যেতে পারলেই বেঁচে যাওয়া ভুল। সবখানে সমস্যাকে এড়িয়ে গেলে সমাধান নয়। অপরাধী যে-ই হোক, অপরাধকে ঢাকতে গেলে অন্যায় বাড়বেই। ন্যায়ের সমাদরে এবং সততার সঙ্গে কেউ পথ চলতে না পারলেও মিথ্যার সঙ্গে বসবাস করা ক্ষতি। প্রতিটি ঘরের কর্তা, প্রতিটি সমাজপতি, প্রতিটি মহল্লার প্রধান এবং প্রতিটি বিভাগের চালক সৎ হলে সততা একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই। মানুষ ভুল করবে তবে বারবার ভুল করা মানুষের বোকামি নয়—স্বভাব—দোষের। অভ্যাসের দাস বলে কোনো কথা নেই। চেষ্টায় সবকিছু অর্জন এবং চেষ্টায় সবকিছু সফল। চেষ্টা করতে হবে। মন উদার এবং পরিষ্কার রাখতে হবে। আদত বদলাতে হবে। তবেই একটি জাতি বা দেশ উন্নতির শীর্ষে পৌঁছা কিবা বদলে যাওয়া সম্ভব। একজন হীনমন্যতা নিয়ে পথ চললে আরেকজন উদারমনা হতে পারে না। তবে উদারমনা হওয়া জরুরি, নইলে জাতিগতভাবে পিছনে ত অনেক পিছনে। ‘তুমি অধম বলে আমি কেন উত্তম হব না’ এ কথাটা যার ভিতরে সব সময় জাগ্রত থাকে সে-ই উন্নতজাতির পিতা।

 

একদম ঠিক, মানুষ যা কল্পনা করে তা কখনো হয় না আর যা কল্পনা করে না হঠাৎ তা-ই হয়ে যায়! কখনো আমি কল্পনা করিনি কালি ও কলমের সঙ্গে হবে আমার হৃদ্যতা এবং ঘনিষ্ঠতা। ভাগ্যে কাকে কোথায় নিয়ে যায় এবং কাকে কোথায় এনে দাঁড় করায় একমাত্র ভাগ্যধাতাই জানে। কোনো অভাগা ও ভাগ্যবানের জানার ক্ষমতা বা দক্ষতা নেই। এটাই হলো ভালমন্দের কপাল। কেউ পানির উপর হাঁটছে ত কেউ উড়ছে হাওয়ায় ওটা কারো ভাগ্য নয়—একমাত্র সাধনার বল। মানুষ বলতেই সকলে এক। শুধু মানুষের কর্ম ভিন্ন, ধর্ম ভিন্ন, মস্তিষ্কের চিন্তা ভিন্ন, গায়ের রং ভিন্ন আর অন্তরের ভাব ভিন্ন এবং চাহার চাহনি ভিন্ন। এখানেই মানুষের ভিন্নতা আর এখানেই মানুষের অমিল। অন্যথায় সকলে সমান এবং সকলেরই পরিণতি এক।

কবি আযাহা সুলতান

সকল পোস্ট : আযাহা সুলতান

৬ thoughts on “অনেক কথা (পর্ব ৩)

  1. মানুষ ধোঁকা খেতে খেতে একসময় নিজেই ধোঁকাবাজে পরিণত হয়। দুনিয়ার অভিধানে বোধহয় ‘ধোঁকা’ শব্দ না থাকলে ‘মিথ্যা’ শব্দও থাকত না।— ভালোই বলেছেন প্রিয়।

    আপনার শেষের লিখার বাস্তবতায় বাস্তব।

    অবিরত শুভেচ্ছা।

  2. ‘আপদ কেটে গেলে আমি নিরাপদ’ তবে সবক্ষেত্রে বিপদ ডিঙিয়ে যেতে পারলেই বেঁচে যাওয়া ভুল। সবখানে সমস্যাকে এড়িয়ে গেলে সমাধান নয়। অপরাধী যে-ই হোক, অপরাধকে ঢাকতে গেলে অন্যায় বাড়বেই।

    সহমত জানাই।

মন্তব্য করুন